• ঢাকা
  • বুধবার, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ০৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

২০০ টাকার চামড়া, ৭০০০ টাকার জুতা — আসল লাভটা যাচ্ছে কার পকেটে?


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:২৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

কোরবানির ঈদ এলেই দেশের হাট-বাজারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে দাঁড়ায় গরুর চামড়ার দাম। যে চামড়া একসময় গ্রামের এতিমখানা, মাদ্রাসা কিংবা সাধারণ মানুষের জন্য আয়ের বড় উৎস ছিল, আজ সেটিই অনেক জায়গায় ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ সেই একই চামড়া থেকে তৈরি একটি ব্র্যান্ডের জুতা বাজারে বিক্রি হয় ৫ হাজার, ৭ হাজার এমনকি ১০ হাজার টাকাতেও। প্রশ্ন উঠতেই পারে— এত বিশাল ব্যবধান কেন? আসলেই কি চামড়ার মূল্য কম, নাকি ব্যবস্থার কোথাও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে?.

চামড়ার প্রকৃত মূল্য কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?.

একটি গরুর কাঁচা চামড়া সরাসরি জুতা হয় না। কাঁচা চামড়া সংগ্রহের পর সেটি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ট্যানারি, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং, শ্রম, পরিবহন ও বিপণনের দীর্ঘ ধাপ অতিক্রম করে। ব্যবসায়ীরা প্রায়ই এই যুক্তি দেন যে, ২০০ টাকার চামড়া থেকে ৭০০০ টাকার জুতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কারণ জুতার দামে শুধু চামড়া নয়, আরও অনেক খরচ যুক্ত থাকে।.

কিন্তু বাস্তবতা হলো— পুরো উৎপাদন শৃঙ্খলে সবচেয়ে অবহেলিত অবস্থানে আছেন প্রাথমিক বিক্রেতা, অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ও কোরবানিদাতা। তারা ন্যায্য দাম পান না, অথচ মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় ব্যবসায়িক চক্র লাভের বড় অংশ নিয়ে নেয়।.

বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা.

বাংলাদেশে কোরবানির সময় লাখ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়। কিন্তু সংরক্ষণের অভাব, পর্যাপ্ত লবণের সংকট, স্থানীয় পর্যায়ে সিন্ডিকেট এবং বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে অনেক সময় চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এতে বিক্রেতারা বাধ্য হয়ে অস্বাভাবিক কম দামে চামড়া বিক্রি করেন।.

আরেকটি বড় সমস্যা হলো— কাঁচা চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত। যখন দাম কমানোর প্রয়োজন হয়, তখন বলা হয় “বিশ্ববাজারে চাহিদা কম।” কিন্তু যখন চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করা হয়, তখন সেই বিশ্ববাজারের নামেই হাজার হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করা হয়। অর্থাৎ লোকসানের গল্পটা শোনানো হয় উৎপাদককে, আর লাভের হিসাবটা থাকে শিল্পমালিকদের কাছে।.

শুধু চামড়ার দাম নয়, এটি সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি.

একজন মানুষ ধর্মীয় অনুভূতি থেকে কোরবানি দিলেন। তিনি আশা করলেন চামড়ার অর্থ হয়তো কোনো এতিমখানা বা সামাজিক কাজে লাগবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেই চামড়া পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে শহরের শোরুমে চকচকে আলোয় সাজানো “জেনুইন লেদার” জুতার দাম কয়েক হাজার টাকা।.

এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনীতির নয়, এটি সামাজিক বৈষম্যেরও প্রতিচ্ছবি। উৎপাদক, সংগ্রাহক ও সাধারণ মানুষের শ্রমের মূল্য যেখানে কমে যায়, আর ব্র্যান্ড ও বিপণনের নামে অতিরিক্ত মুনাফা কেন্দ্রীভূত হয় কিছু গোষ্ঠীর হাতে।.

সমাধান কোথায়?.

চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে—.

স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ানো.

চামড়া সংগ্রহ ও বিক্রিতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ.

মাদ্রাসা ও এতিমখানার জন্য সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি.

ট্যানারি শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা.

দেশীয় চামড়াজাত শিল্পের লাভের একটি অংশ প্রাথমিক সংগ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো.

শেষ কথা.

২০০ টাকার চামড়া আর ৭০০০ টাকার জুতার মধ্যে শুধু ব্যবসায়িক ব্যবধান নেই, আছে ন্যায্যতা ও বৈষম্যের গল্প। কাঁচামালের প্রকৃত মালিক যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে সেই শিল্প যত বড়ই হোক, সেটিকে সুস্থ অর্থনীতি বলা যায় না।চামড়ার বাজার শুধু ব্যবসার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, গ্রামীণ বাস্তবতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। তাই সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার— “চামড়ার প্রকৃত দাম কে পাচ্ছে, আর কে বঞ্চিত হচ্ছে?”.

 .

লেখা : সামসিল আরিফিন.

.

Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ

সম্পাদকীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ