বগুড়া শহরের সাতমাথা, ঠনঠনিয়া ও কলোনি এলাকার মাত্র আড়াই কিলোমিটার পরিসরের মধ্যেই গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার এই ব্যাপক বিস্তার একদিকে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করেছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিক কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনায় এসব প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।.
গত কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক ক্লিনিক ও হাসপাতালে চিকিৎসা অবহেলা কিংবা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। ৩০ মে খান্দার এলাকার সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকে সন্তান প্রসবের সময় বগুড়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী অহনার মৃত্যু হয়। পরদিন কানুছগাড়ী এলাকার সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে আড়াই মাস বয়সী শিশু আয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২ জুন চকযাদু রোডের সারা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শাপলা নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলেন।.
এছাড়া পিটিআই মোড়ের আলিফ জেনারেল হাসপাতালে এসএসসি পরীক্ষার্থী সিয়ামের মৃত্যুর অভিযোগ, জলেশ্বরীতলার এনাম ক্লিনিকে এক নারী ও তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনা এবং সোনার দেশ ক্লিনিক ও প্রভাতী ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।.
যদিও প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি দায়ী করা সমীচীন নয়, তবে একের পর এক অভিযোগ বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব চিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।.
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার জন্য শুধু লাইসেন্স থাকাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স, আধুনিক যন্ত্রপাতি, জরুরি সেবার ব্যবস্থা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনুমোদিত সেবার বাইরে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে কিংবা পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে।.
স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানগুলোতে ইতোমধ্যে ঠনঠনিয়া, সূত্রাপুর, কলোনি ও সাতমাথা এলাকার কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন কার্যক্রমের অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, অনিয়ম যদি আগে থেকেই থেকে থাকে, তাহলে সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে চলতে পারল?.
স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি খাত যেখানে ভুলের মূল্য একজন মানুষের জীবন। তাই কেবল জরিমানা নয়, নিয়মিত পরিদর্শন, মান যাচাই এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।.
চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেকেই প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, চিকিৎসকের যোগ্যতা কিংবা সেবার মান যাচাই করেন না। কম খরচ বা কাছাকাছি হওয়ার কারণে অনেক সময় অপর্যাপ্ত সুবিধাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপদে পড়তে হয়। সচেতনভাবে অনুমোদিত ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও প্রয়োজন।.
বগুড়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠা উদ্বেগজনক। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি চিকিৎসা অবহেলা, অনিয়ম বা অনুমোদনবহির্ভূত কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।.
মানুষ হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যায় জীবন বাঁচানোর আশায়, জীবন হারানোর জন্য নয়। তাই বগুড়ার স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। স্বাস্থ্যসেবার নামে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা বা বাণিজ্যিক অনিয়ম যেন মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করতে না পারে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের নজর দেওয়া জরুরি।. .
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: