বগুড়া রাজা বাজারের “রাজা সাহেব” (এটি কোনো নাম নয়, একটি উপাধি) হিসেবে পরিচিত ছিলেন শাহ্ আফজালাল আরেফিন আবু নাসেহ্, যিনি “আরিফ শাহ্” নামেও সুপরিচিত। তাঁর পারিবারিক বংশধারা, সামাজিক প্রভাব এবং দানশীল কর্মকাণ্ড তাঁকে ইতিহাসে একটি বিশেষ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পারিবারিক পরিচিতি
রাজা সাহেবের পূর্ণ নাম শাহ্ আফজালাল আরেফিন আবু নাসেহ্ (আরিফ শাহ্)। তাঁর পিতা শাহ মোহাম্মদ খলিলুদ্দিন হায়দার আবু জোবেহ্ এবং পিতামহ শাহ্ মোহাম্মদ নাজিমুউদ্দিন আবুল হোসেন।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৪ সালের ৯ই নভেম্বর, ভারতের মুর্শিদাবাদের সালারে। মৃত্যু হয় ২০১৭ সালের ১৮ই জানুয়ারি, ঢাকায়। পারিবারিকভাবে তিনি ছিলেন তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে একজন।
তাঁর পিতা শাহ মোহাম্মদ খলিলুদ্দিন হায়দার আবু জোবেহ্ হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর ২১/২২তম বংশধর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দুইবার ভারত বিধানসভার নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে সিলেক্টেড মেম্বার হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
এলিট সিটিজেন হিসেবে স্বীকৃতি
ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন “বড়লাট” মাত্র ১৭ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে “এলিট সিটিজেন” হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেই তালিকায় রাজা সাহেব এবং তাঁর পিতার নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক ছবি আজও কলকাতার গভর্নর হাউজে সংরক্ষিত রয়েছে।
পারিবারিক আভিজাত্য ও জীবনধারা
রাজা সাহেবের পারিবারিক আবাসস্থল ছিল মুর্শিদাবাদের সালারে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদসদৃশ বাড়ি। সেখানে হাতিশাল, ঘোড়াশাল, লন টেনিস কোর্টসহ নানা ধরনের রাজকীয় সুবিধা বিদ্যমান ছিল।
তাঁর পিতা একবার তাঁকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—
“বাবা, আমি জানলাম তুমি কোনো কাজে কালেক্টরের (বর্তমানে ডিসি) অফিসে গিয়েছিলে। কিন্তু আমরা সাধারণত কোনো অফিসে যাই না; দরকার হলে কালেক্টরকে বাসায় ডেকে নিও।”
এই বক্তব্য থেকে তাঁদের পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের ধারণা পাওয়া যায়।
সমাজসেবা ও দানশীলতা
রাজা সাহেব ছিলেন প্রচারবিমুখ একজন সমাজসেবক। তিনি বহু স্কুল-কলেজ, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলেও নিজের নাম ব্যবহার করেননি। শুধুমাত্র নামাজগড়ের “কারবালার মাদ্রাসা” ব্যতীত অন্য কোথাও তাঁর নাম যুক্ত করা হয়নি।
তাঁদের এস্টেট থেকে “তালেবুল এলম” নামে একটি সমাজসেবামূলক বৃত্তি প্রদান করা হতো। এই বৃত্তির সুবিধাভোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং বারডেম হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম, যিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া বগুড়ার করনেশন স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বগুড়া সেন্ট্রাল ঈদগাহের জমিও রাজা সাহেবদের দানে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জমিদারি ও প্রশাসনিক কাঠামো
বগুড়ার নুনগোলা, দশটিকা ও বারবাকপুর এলাকায় তাঁদের দক্ষ লাঠিয়াল বাহিনী ছিল, যার মাধ্যমে জমিদারি পরিচালনা করা হতো। প্রজাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাবের কারণে মাঝে মাঝে খাজনাও মওকুফ করা হতো।
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো— “রাজা-সাহেব এস্টেট” সম্পূর্ণ একক মালিকানাধীন ছিল। বাস্তবে এটি ছিল বগুড়া জমিদারের ৯ আনা এবং সাতানি বাড়ির ৭ আনা—মোট ১৬ আনার সমন্বয়ে গঠিত। “রাজা-সাহেব এস্টেট” (ভাই) এবং “সাতানি-বাড়ি” (বোন)-এর সম্পর্ক ছিল ভাই-বোনের মতো।
আত্মীয়তা ও ঐতিহাসিক সম্পত্তি
বগুড়ার নবাব বাড়ি, টাঙ্গাইলের করোটিয়ার ধনবাড়ি এবং ঢাকার নবাব বাড়ির সঙ্গে রাজা সাহেবদের পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল।
একটি অজানা তথ্য হলো—তৎকালীন নবাব বাড়ি ও আশেপাশের অনেক জায়গা একসময় রাজা-সাহেব এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা আগে নীলকুঠি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে সেখানেই নবাব বাড়ির প্রতিষ্ঠা হয়।
স্থাপনা ও ঐতিহাসিক ঘটনা
রাজা বাজারে অবস্থিত তাঁদের তিনতলা বাড়িটি (বর্তমান রেললাইনের সিঁড়ির পাশে) ১৯৩২ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। পরে সেখানে একতলা একটি নতুন বাড়ি নির্মাণ করা হয়।
এই বাড়িতে একসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ—মন্ত্রী, গভর্নর, উচ্চপদস্থ আমলা এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা
একটি প্রচলিত তথ্যানুযায়ী, “George Kelahan” নামের একজন ব্যক্তি এই মনোরম নদীপাড়ের বাড়িতে এসে জমিদারি পোশাক পরে নৌকায় ছবি তুলেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বলে উল্লেখ করা হয়।
সব মিলিয়ে, রাজা সাহেব ছিলেন একাধারে ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি, সমাজসেবক এবং প্রচারবিমুখ দাতা। তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড বগুড়া অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।.
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: