খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে মণপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে পাম ওয়েলের দাম। অথচ পাম ওয়েল মূলত মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়, যার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।.
.
পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও দেশের অন্যতম বৃহৎ নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। যদিও এসব পণ্য ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই আমদানি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।.
লাতিন আমেরিকা থেকে সয়াবিন চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৪৫ দিন। তবে গত ১ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের খবরে দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে সয়াবিনের মণপ্রতি দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৪ লাখ ৬৩ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে।.
পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপটে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে।.
শুধু সয়াবিন নয়, খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে মণপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে পাম ওয়েলের দাম। অথচ পাম ওয়েল মূলত মালয়েশিয়া থেকে আমদানি হয়, যার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশে ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন পাম অয়েল আমদানি হয়েছে।.
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব পণ্য ইতোমধ্যে মজুত রয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাবে দাম বাড়ার প্রশ্নই আসে না। যদি দাম বাড়েও, তার প্রভাব পড়তে অন্তত আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের নীরবতা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম উদ্দিন হাছান আওরঙ্গজেব টিবিএসকে বলেন, "সরকার এখনো তেলের দাম বাড়ায়নি। তেলের দাম বাড়লে অন্য পণ্যে কিছু প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে এখনো দ্রব্যমূল্যে প্রভাব পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। হলেও তার জন্য আরও কিছু সময় লাগবে। মূলত অসাধু ব্যবসায়ীরাই দাম বাড়াচ্ছেন।".
ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে খাতুনগঞ্জেও দাম বাড়ে, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে কমলে এখানেও কমে। সয়াবিনের দামে ওঠানামা স্বাভাবিক। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মিল মালিকরা বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন। .
দেশে যথেষ্ট গম রয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে কস্টিং বাড়লে তার প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়ে। ভোগ্যপণ্যের দাম অনেকটাই আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতি ও রিজার্ভেও প্রভাব পড়তে পারে বলে জানান তারা।.
খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১ মার্চ বিকাল পর্যন্ত খোলা পরিশোধিত পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম ছিল ৫ হাজার ৯০০ টাকা। ইরানে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সন্ধ্যার দিকে তা বেড়ে ৬ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। পরদিন কিছুটা কমলেও আবার প্রায় ২০০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৬ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে।.
একইভাবে গমের দাম বেড়ে মণপ্রতি ১ হাজার ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগে প্রায় ১৫০ টাকা কম ছিল। এছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের মণপ্রতি দাম ১২০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়ে ৭ হাজার ১৮০ থেকে ৮ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।.
চিনির দামও মণপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৪৭০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। ২০০ টাকা বেড়ে সুপার অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৪০০ টাকায়।.
ড্রাম বিটুমিনের দাম বেড়ে হয়েছে ১৫ হাজার টাকা, যা আগে ছিল প্রায় ১২ হাজার টাকা। কিসমিস বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকায়, যেখানে মানভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।.
সবচেয়ে বেশি বেড়েছে টক আলুর দাম। আগে মণপ্রতি দাম ছিল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ৮০০ থেকে হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।.
বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়া ডাল ও শুকনো খাদ্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী। যদিও রমজান শুরুর পর পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছিল।.
বর্তমানে জিরা কেজিপ্রতি ৫৭০ থেকে ৫৮০ টাকা, এলাচ ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা, দারুচিনি ৩৫৫ থেকে ৪৫০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩২০ টাকা এবং গোলমরিচ ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।.
এ ছাড়া জায়ফল ৭২০ টাকা, জয়ত্রী ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা, আদা ১০০ থেকে ১১০ টাকা এবং মানভেদে পেঁয়াজ ২৫ থেকে ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চায়না রসুন কেজিপ্রতি ২০০ টাকা এবং দেশি রসুন প্রায় ৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।.
চাক্তাই–খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, "কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্যের দাম এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে, তখন সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।".
অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন টিবিএসকে বলেন, "ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য একটি ইস্যু খোঁজে। যুদ্ধের কারণে একটি ইস্যু পাওয়া গেছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এত দ্রুত বাজারে প্রভাব পড়ার প্রশ্নই আসে না। জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হলে পরিবহন খরচের কারণে কিছু প্রভাব পড়তে পারে, তবে তা এখনই নয়।".
তিনি আরও বলেন, "প্রশাসনও এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নতুন সরকার এলেও মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনকে এখনো কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে।".
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: