• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ০৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

বগুড়ায় বছরের শুরুতেই ৩০ খুন


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৯:২৮ পিএম
ছবি : প্রতীকী
ছবি : প্রতীকী

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বগুড়া জেলায় গত কয়েক বছরে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৬৪ মাসে জেলায় মোট ৪৩০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই ৩০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা বছরের শুরুতেই সহিংসতার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও ২০২৪ সালে ৯৫টি হত্যার তুলনায় ২০২৫ সালে তা কমে ৫৭টিতে নেমে আসে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল বলা যাচ্ছে না। বরং ধারাবাহিকভাবে ছোট-বড় নানা কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। জেলা পুলিশের তথ্যে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬টি, মার্চে ১০টি এবং এপ্রিলে আরও ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে মার্চ ও এপ্রিল মাসে হত্যার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করছে। অতীতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে জেলায় ৭৭টি, ২০২২ সালে ৮৯টি এবং ২০২১ সালে ৮২টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪০০টি খুনের ঘটনা ঘটে, যার সঙ্গে চলতি বছরের প্রথম চার মাসের ৩০টি যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩০-এ। হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তুচ্ছ বিরোধ থেকে শুরু করে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, জমিজমা নিয়ে সংঘর্ষ, সামাজিক আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মাদকসংক্রান্ত বিরোধ—সবই এই হত্যার পেছনের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এসব ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট, সহিংসতার প্রবণতা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা জনমনে স্থায়ী ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। অনেকেই মনে করছেন, দিনের বেলাতেও একা চলাফেরা নিরাপদ নয়, আর সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও শঙ্কাজনক হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালে জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ৫৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৪টি ঘটনা ঘটে বগুড়া সদর থানা এলাকায়। এছাড়া শাজাহানপুর ও শেরপুরে ৭টি করে, শিবগঞ্জে ৪টি, গাবতলী ও দুপচাঁচিয়ায় ৪টি করে, নন্দীগ্রামে ৪টি, কাহালুতে ৩টি, সারিয়াকান্দিতে ৩টি, ধুনটে ৩টি এবং আদমদিঘী ও সোনাতলায় ২টি করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এই বিস্তৃত ভৌগোলিক বিস্তৃতি দেখায় যে সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো জেলাজুড়েই এর প্রভাব রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। মার্চের শেষ দিকে স্থানীয় একটি সমবায় সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী আলাল শেখকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়, যা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর কিছুদিন পরই শিবগঞ্জে নিজ বাড়িতে অবসরপ্রাপ্ত এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। একই সময় মোকামতলা এলাকায় প্রতিপক্ষের হামলায় আরেক বৃদ্ধা নিহত হন। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখায়, সহিংসতা শুধু অপরাধচক্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সাধারণ নাগরিকরাও এর শিকার হচ্ছেন। ২০২৫ সালেও একাধিক নৃশংস ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে হত্যা, বিয়ে সংক্রান্ত বিরোধে পিটিয়ে হত্যা, প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের উপর হামলা এবং সেনাসদস্যের পরিবারের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব ফেলেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইন বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক নিরাপত্তার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে হবে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় সমাজে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যা নতুন করে অপরাধে উৎসাহ জোগাচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বিট পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধুমাত্র প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়—সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাও প্রয়োজন। সার্বিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, বগুড়ায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কিছুটা কমার প্রবণতা থাকলেও তা এখনো উদ্বেগমুক্ত নয়। বরং ধারাবাহিক সহিংসতা, বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং সামাজিক অস্থিরতা মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।.

 .

তথ্য সূত্র : চ্যানেল টেন . .

Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ

অপরাধ বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ