বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া খোলা ও বোতলজাত—উভয় ধরনের সয়াবিন তেলেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষকের পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা ৬০টি সয়াবিন তেলের নমুনার প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়েছে।গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ব্র্যান্ডেড বোতলজাত তেলে গড়ে ৪৮ হাজার ৬৭টি এবং খোলা বা নন-ব্র্যান্ডেড তেলে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ খোলা তেলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বোতলজাত তেলের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি।বিশ্বখ্যাত Journal of Food Composition and Analysis-এ ২০২৬ সালের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষকরা রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপ থেকে তিনটি ব্র্যান্ডের বোতলজাত সয়াবিন তেল এবং ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকার খোলা বাজার থেকে তিন ধরনের নন-ব্র্যান্ডেড তেলের নমুনা সংগ্রহ করেন। আধুনিক পরীক্ষাগার প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।গবেষণায় সয়াবিন তেলে ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে। এগুলো হলো—লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এলডিপিই), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (এইচডিপিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিইথিলিন টেরেফথালেট (পিইটি), পলিইউরেথেন (পিইউ) এবং নাইলন। গবেষকদের দাবি, ভোজ্যতেলে প্রথমবারের মতো পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলোর মধ্যে ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল ফাইবার বা তন্তুজাতীয় কণা। এছাড়া ফ্র্যাগমেন্ট, ফিল্ম, ফোম, পেলেট ও বিড ধরনের কণাও পাওয়া গেছে। এসব ফাইবার সিনথেটিক কাপড়, প্লাস্টিকজাত যন্ত্রাংশ, উৎপাদন পরিবেশ এবং বাতাসে ভাসমান কৃত্রিম তন্তু থেকে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।গবেষণায় দেখা গেছে, তেজগাঁও থেকে সংগ্রহ করা খোলা তেলের নমুনায় সবচেয়ে বেশি দূষণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ, পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পাত্রে তেল সংরক্ষণ, খোলা অবস্থায় বিক্রি এবং স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি এর অন্যতম কারণ হতে পারে। অন্যদিকে বোতলজাত তেলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাওয়ায় উৎপাদন, পরিশোধন, প্যাকেজিং কিংবা পরিবহনের বিভিন্ন ধাপেও প্লাস্টিক কণা তেলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে বলে তারা মনে করছেন।গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধুমাত্র সয়াবিন তেল থেকেই প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও বেশি—প্রতিদিন প্রায় ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি কণা শরীরে প্রবেশ করতে পারে।গবেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে জমা হলে তা প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এই গবেষণা সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারণ প্রমাণ করেনি; বরং সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে এবং এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।গবেষণার প্রধান লেখকদের একজন রুনা আক্তার মীম বলেন, বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় সয়াবিন তেলের ব্যাপক ব্যবহার বিবেচনায় এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। যদিও বর্তমান মূল্যায়নে দূষণের মাত্রা ‘মধ্যম’ এবং সামগ্রিক ঝুঁকি ‘নিম্ন’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। গবেষকরা ভোজ্যতেল উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা, খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা সম্প্রসারণ এবং এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করেছেন।.
Ajker Bogura / সামসিল আরিফিন
আপনার মতামত লিখুন: