বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শহর বগুড়া শুধু ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা বাণিজ্যের জন্য নয়, ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত হিসেবেও দেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্র ফতেহ আলী বাজারে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে এমন এক বিরল দৃশ্য, যা যে কাউকে মুহূর্তেই আবেগাপ্লুত করে—মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সুফি সাধক শাহ ফতেহ আলী (র.)-এর মাজারসংলগ্ন মসজিদ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার স্থান শ্রী শ্রী আনন্দময়ী মা কালী মন্দির। একপাশে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সুমধুর আজান ধ্বনি, অন্যপাশে সন্ধ্যা নামলেই বেজে ওঠে ঘণ্টা আর শঙ্খের মধুর সুর; কিন্তু এই দুই ভিন্ন ধর্মীয় উপাসনার শব্দ কখনোই বিভেদের দেয়াল তৈরি করেনি, বরং যুগের পর যুগ ধরে একে অন্যের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার এক অসাধারণ বার্তা বহন করে চলেছে। প্রায় আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালন করে আসছেন, অথচ সামান্যতম বিরোধ বা উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেনি। বরং কালীপূজায় মাজার কমিটির লোকজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, আবার ওরশের সময় সনাতন ধর্মাবলম্বীরাও ভক্তিভরে অংশ নেন, এমনকি মাজারের সিন্নি গ্রহণ করেন আন্তরিকতার সঙ্গে। স্থানীয় প্রবীণরা বলেন, এখানে ধর্ম আলাদা হলেও মানুষের হৃদয় আলাদা নয়; একে অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করাই এই এলাকার বহু প্রজন্মের শিক্ষা। শাহ ফতেহ আলী (র.)-এর আধ্যাত্মিক প্রভাব এবং মন্দিরের শতবর্ষী ঐতিহ্য মিলেমিশে এই এলাকাকে পরিণত করেছে শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীকে। আজ যখন বিশ্বের নানা প্রান্তে ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভাজন ও সহিংসতার খবর শোনা যায়, তখন বগুড়ার ফতেহ আলী বাজার নীরবে জানিয়ে দেয়—সম্প্রীতি শুধু একটি শব্দ নয়, এটি একটি চর্চা, একটি বিশ্বাস, একটি উত্তরাধিকার; আর সেই উত্তরাধিকারকে বুকে ধারণ করেই বগুড়া আজ সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির এক গর্বিত রাজধানী হয়ে উঠেছে।.
.
স্টাফ রিপোর্টার: সামসিল আরিফিন . .
Ajker Bogura / ডি আর/ এস এ
আপনার মতামত লিখুন: