বগুড়ার অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ জীবনের শেষ আশ্রয় হিসেবে ছুটে আসেন এই হাসপাতালে। কেউ আসেন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে, কেউ দীর্ঘদিনের রোগ নিয়ে, আবার কেউ আসেন প্রিয়জনের জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এসে বহু মানুষকে প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয় অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, ভোগান্তি ও এক ধরনের অমানবিক বাস্তবতার।.
হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ বহু পুরোনো। ওয়ার্ডে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অপরিচ্ছন্ন করিডোর, দেয়ালের কোণায় জমে থাকা পানের পিক, থুতু, কফ, ময়লার স্তূপ, পড়ে থাকা বিস্কুট বা খাবারের প্যাকেট। অনেক স্থানে দুর্গন্ধে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব যেন এখন হাসপাতালের নিত্যদিনের দৃশ্য।.
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হুইলচেয়ার কিংবা ট্রলি ব্যবহার করতেও রোগীর স্বজনদের গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। যেগুলো সরকারি সম্পদ এবং সাধারণ মানুষের সেবার জন্য বরাদ্দ, সেগুলো ব্যবহারেও যদি অর্থ দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই অনিয়মের দায় নেবে কে? অনেকেই বলছেন, হাসপাতালের কিছু ওয়ার্ড বয় ও অসাধু কর্মচারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই এমন অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।.
নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আচরণ নিয়েও মানুষের ক্ষোভ কম নয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, রোগীর জরুরি প্রয়োজনেও সময়মতো সাড়া মেলে না। অনেক সময় ডাক্তার-নার্সদের অবহেলায় রোগীর স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় হতাশা ও ক্ষোভ। তবে এর মাঝেও কিছু মানবিক চিকিৎসক ও নার্সের আচরণ সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়—এমন অভিজ্ঞতার কথাও শোনা যায়। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাকে একপাক্ষিকভাবে বিচার করা না গেলেও, সামগ্রিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।.
সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো বেডের অভাব। একটি বেডে দুই থেকে তিনজন রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় প্রায়ই। অনেক রোগীকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ সংকটও দীর্ঘদিনের। স্বজনদের অভিযোগ, জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ না পেয়ে অনেক রোগীকে ঢাকাসহ অন্যত্র ছোটাছুটি করতে হয়।.
তবে শুধুই কি কর্তৃপক্ষ দায়ী? প্রশ্নটা এখন সমাজের প্রতিও। কারণ হাসপাতালের ভেতরেই প্রায়শই দেখা যায় রোগীর স্বজনদের প্রকাশ্যে ধূমপান করতে। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো শুনতে হয় অপমানজনক কথা। হাসপাতালের বাথরুম ব্যবহার করে অনেকেই পানি পর্যন্ত ঢালেন না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে রাখাও যেন এক স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দেয়ালে পানের পিক ফেলা, করিডোরে থুতু দেওয়া কিংবা খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে রাখা—এসব কি শুধুই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দোষ?.
একটি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়, এটি মানবতা ও সচেতনতারও প্রতিচ্ছবি। কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবার মান ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ভূমিকা না নেয়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। একই সঙ্গে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে হাসপাতালের পরিবেশ রক্ষা করা, নিয়ম মেনে চলা এবং অন্যকে সচেতন করা।.
আজ সময় এসেছে দোষারোপের গণ্ডি পেরিয়ে সম্মিলিতভাবে পরিবর্তনের দাবি তোলার। কারণ একটি সরকারি হাসপাতালের নোংরা করিডোর, অবহেলিত রোগী কিংবা দুর্ব্যবহারের শিকার স্বজন—এসব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো সমাজের বিবেকের প্রতিচ্ছবি।.
.
স্টাফ রিপোর্টার : সামসিল আরিফিন. .
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: