উত্তরবঙ্গের শিক্ষা বিস্তারে যে কটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যুগের পর যুগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, তার মধ্যে অন্যতম সরকারি শাহ সুলতান কলেজ। করতোয়া নদীর পাড়ঘেঁষা মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি কলেজ নয়, বরং বগুড়ার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। বগুড়া শহরের বনানী মোড়ে অবস্থিত এই কলেজটি দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের পাশাপাশি অনার্স ও ডিগ্রি পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হয়। অভিজ্ঞ শিক্ষক, বিস্তৃত ক্যাম্পাস, সমৃদ্ধ একাডেমিক পরিবেশ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের কারণে কলেজটি জেলার অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে কলেজটির প্রতিষ্ঠা উত্তরবঙ্গের শিক্ষাবিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মানুষের প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও জমিদানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৮ সালের ১ জুলাই। প্রথমদিকে বর্তমান পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ভবনে ক্লাস কার্যক্রম পরিচালিত হতো। প্রতিষ্ঠালগ্নে বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তৎকালীন সরকারি আজিজুল হক কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক বয়েন উদ্দিন মিয়া এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।.
কলেজটির নামকরণ করা হয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি সাধক শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (রহ.)-এর নামানুসারে। বগুড়ার ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মহান সাধকের স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। ফলে এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং বগুড়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও ধারক ও বাহক। বর্তমানে কলেজটিতে হাজারো শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে এবং প্রতি বছর এখান থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উন্নয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক উদ্যোগেও কলেজটির শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একসময় উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। সেই বাস্তবতায় সরকারি শাহ সুলতান কলেজ অঞ্চলের অসংখ্য মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীর জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আজকের ডিজিটাল যুগেও কলেজটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল নোটিশ বোর্ড, একাডেমিক রুটিন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি। বগুড়ার শিক্ষা ইতিহাসে সরকারি শাহ সুলতান কলেজ একটি আবেগের নাম। বহু প্রজন্মের স্মৃতি, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সফলতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠান আজও নতুন প্রজন্মের কাছে আস্থা, গৌরব ও সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে আছে। উত্তরবঙ্গের শিক্ষা অঙ্গনে এর অবদান নিঃসন্দেহে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।. .
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: