• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ১০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

বগুড়ার স্মৃতিতে অম্লান হুমায়ূন আহমেদ: জিলা স্কুলের ছাত্র থেকে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৭:৫৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে হুমায়ূন আহমেদ এমন একটি নাম, যাকে বাদ দিয়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্য কল্পনা করাই কঠিন। তাঁর লেখনী ছিল সহজ, সাবলীল এবং হৃদয়ছোঁয়া। তিনি এমনভাবে গল্প বলতেন, যেন পাঠক নিজের জীবনকেই সেখানে খুঁজে পান। এই অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষটির জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা জেলার মতো বগুড়ারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কৈশোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি বগুড়ায় কাটিয়েছেন এবং ঐতিহ্যবাহী বগুড়া জিলা স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এই সময়ের অভিজ্ঞতা, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দিন, স্কুলজীবনের আনন্দ-বেদনা—সবকিছুই তাঁর মনোজগতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনায়। তাঁর পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান ছিলেন একজন সৎ ও নীতিবান পুলিশ কর্মকর্তা, আর মা আয়েশা ফয়েজ ছিলেন স্নেহশীলা ও সাংস্কৃতিক মননের অধিকারী। বাবার চাকরির কারণে ছোটবেলা থেকেই তাঁকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। এই ঘুরে বেড়ানোর মধ্যেই এক সময় তাঁদের পরিবার বগুড়ায় অবস্থান নেয়। সেই সময় তিনি ভর্তি হন বগুড়া জিলা স্কুলে, যা দেশের অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। বগুড়া জিলা স্কুলে পড়াশোনার সময় হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন মেধাবী, কৌতূহলী এবং কিছুটা স্বপ্নবিলাসী স্বভাবের। তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন, বিশেষ করে গল্প ও উপন্যাসের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। স্কুলজীবনেই তাঁর কল্পনাশক্তি বিকশিত হতে শুরু করে। সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা, শিক্ষকদের স্নেহ, এবং বগুড়ার শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে এই সময়টি বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তাঁর অনেক লেখায় যে সরলতা, হাস্যরস এবং গ্রামবাংলার আবহ পাওয়া যায়, তার পেছনে এই সময়ের অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। স্কুলজীবন শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তেমনি একজন লেখক হিসেবেও দ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পরই তিনি সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এরপর একের পর এক উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পাঠক ও দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে মিসির আলী, হিমু, শুভ্র—এসব নাম আজ বাংলা সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর লেখায় যেমন রহস্য আছে, তেমনি আছে দর্শন, ভালোবাসা, একাকিত্ব এবং জীবনের নানা জটিল প্রশ্ন। খুব সাধারণ ভাষায় অসাধারণ কথা বলার ক্ষমতা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি এমনভাবে লিখতেন, যেন প্রতিটি পাঠক মনে করেন—এই গল্পটি তার নিজের। চলচ্চিত্র ও নাটকের জগতেও তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি বহু জনপ্রিয় নাটক নির্মাণ করেছেন, যা এখনো মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোও দর্শকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তিনি শুধু বিনোদন দেননি, বরং মানুষের চিন্তাভাবনায়ও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিজীবনে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও হাস্যরসপ্রিয় মানুষ। তিনি প্রকৃতি ভালোবাসতেন, নির্জনতা পছন্দ করতেন, এবং মানুষের ছোট ছোট আনন্দকে গভীরভাবে অনুভব করতেন। তাঁর গাজীপুরের নুহাশ পল্লী ছিল তাঁর প্রিয় আশ্রয়স্থল, যেখানে তিনি সময় কাটাতে ভালোবাসতেন এবং সৃষ্টিশীল কাজ করতেন। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর লেখা, তাঁর চরিত্রগুলো আজও বেঁচে আছে এবং ভবিষ্যতেও বেঁচে থাকবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বগুড়ার জন্য হুমায়ূন আহমেদ একটি গর্বের নাম। কারণ এই জেলার মাটিতে তাঁর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল। বগুড়া জিলা স্কুলে কাটানো সময় তাঁর জীবনের ভিত্তি গঠনে সহায়ক ছিল। তাই বলা যায়, বগুড়ার স্মৃতি তাঁর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবশেষে বলা যায়, হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখক নন, তিনি একটি অনুভূতি, একটি যুগের নাম। আর সেই যুগের সঙ্গে বগুড়ার সম্পর্ক চিরদিনের জন্য ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে।.

.

Ajker Bogura / সামসিল আরিফিন

স্মরণীয় ও বরণীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ