• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ; ০৩ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

মুষ্টির চাল থেকে মহীরুহ: টিএমএসএস ও ড. হোসনে আরা বেগমের ৬২ বছরের সংগ্রামের অবিশ্বাস্য গল্প


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৬:১২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

মুষ্টির চাল থেকে মহীরুহ: টিএমএসএস ও ড. হোসনে আরা বেগমের ৬২ বছরের সংগ্রামের অবিশ্বাস্য গল্প.

বগুড়ার সদর উপজেলার গোকুল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম ঠেঙ্গামারা। একসময় যে গ্রামের নাম ছিল কেবলই অবহেলিত, দারিদ্র্য আর বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি—সেই গ্রামের কয়েকজন অসহায় নারী ও ভিক্ষুকের হাত ধরেই ১৯৬৪ সালে জন্ম নেয় একটি ছোট্ট সামাজিক উদ্যোগ। নাম ছিল ‘ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ’। আজ সেই ছোট্ট উদ্যোগই রূপ নিয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস (TMSS)-এ।.

এক মুঠো চাল, সামান্য আশা আর মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা—এই তিনটি শক্তিকে পুঁজি করে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তা আজ কোটি মানুষের জীবনে পরিবর্তনের গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পথচলার নেপথ্যে রয়েছে অসংখ্য দরিদ্র নারীর ঘাম, ত্যাগ এবং একজন দূরদর্শী নারীর নেতৃত্ব—ড. হোসনে আরা বেগম।.

ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু নতুন লড়াই

১৯৬৪ সালে গোকুল হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন হোসনে আরা বেগম। তখন ফাতেমা নামের এক নারী ভিক্ষুকের নেতৃত্বে কয়েকজন অসহায় নারীকে নিয়ে শুরু হয় সংগঠনটির কার্যক্রম। সদস্যদের অধিকাংশই ছিলেন সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষ—কেউ ভিক্ষা করতেন, কেউ দিনমজুরের কাজ করতেন, কেউ অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন।.

একটি ছোট মাটির ঘর ছিল তাদের ঠিকানা। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সেই ঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর থমকে যায় সংগঠনের কার্যক্রম। মনে হচ্ছিল, হয়তো এখানেই শেষ হবে স্বপ্নের পথচলা।.

কিন্তু ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় ১৯৮০ সালে।.

২ টাকার সঞ্চয়ে বদলে যায় ইতিহাস

১৯৮০ সালে ড. হোসনে আরা বেগম যখন সংগঠনের দায়িত্ব নেন, তখন সম্পদ বলতে ছিল একটি মাটির ঘর, কিছু পুরোনো নথিপত্র, ২৫টি ড্রাম, ২০৬ মণ চাল এবং ১২৬ জন দরিদ্র নারী।.

তিনি নতুন করে সংগঠনকে দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন। প্রতি মঙ্গলবার সদস্যদের সভা করার সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন প্রায় ৫০০ নারী উপস্থিত হন। তাদের মধ্য থেকে ৩৩৬ জনকে নিয়ে শুরু হয় নতুন যাত্রা।.

তবে ভিক্ষার চাল জমা নিয়ে দেখা দেয় সমস্যা। কারো চাল ভালো, কারো চাল খারাপ—এ নিয়ে তৈরি হয় মতবিরোধ। সেই সমস্যা সমাধানে নেওয়া হয় ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত—চালের পরিবর্তে প্রত্যেকে প্রতি মঙ্গলবার জমা দেবেন ২ টাকা।.

এই ২ টাকার সঞ্চয়ই পরবর্তীতে টিএমএসএসের আর্থিক ভিত্তি তৈরির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে ওঠে।.

দরিদ্র নারীর শ্রমে তৈরি হয় মূলধন

১৯৮২-৮৩ সালের দিকে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা আসতে শুরু করে। ইউনিসেফের সহায়তায় শুরু হয় স্যানিটেশন সামগ্রী তৈরির কাজ। দরিদ্র সদস্যরাই নদী থেকে বালু সংগ্রহ করতেন, রাস্তার পাশ থেকে ফেলে দেওয়া খোয়া কুড়িয়ে আনতেন, তৈরি করতেন রিং ও ল্যাট্রিন।.

সিমেন্ট কিনে এনে এসব পণ্য তৈরি করে বিক্রি করা হতো। তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই একসময় তৈরি হয় প্রায় ২৭ লাখ টাকার নিজস্ব মূলধন।.

ড. হোসনে আরা বেগমের ভাষায়—
“গরিব-অসহায় মানুষের কাজ করার জন্য এমনই একটি জায়গা আমি খুঁজছিলাম। এটাই ছিল আমার মূল জেদ।”.

নিরাপদ চাকরি ছেড়ে মানুষের পাশে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর সমাজসেবায় যুক্ত হন হোসনে আরা বেগম। ১৯৭৯ সালে তিনি বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সরকারি চাকরি, স্থায়ী ভবিষ্যৎ—সবই ছিল সামনে।.

কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকতো অসহায় মানুষের মাঝে। ক্লাসের ফাঁকে তিনি গরিব মানুষের আইনি সহায়তা করতেন, হাসপাতালে গিয়ে অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়াতেন।.

একসময় ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের নারীরা তাঁর কাছে এসে অনুরোধ করেন—তাদের একজন শক্ত নেতৃত্ব দরকার। দরকার একজন “শক্ত মাথার ছাতা”।.

এরপর তিনি জীবনের নিরাপদ পথ ছেড়ে বেছে নেন মানুষের জন্য সংগ্রামের কঠিন পথ।.

জীবন বদলে দেওয়া উপলব্ধি

ড. হোসনে আরা বেগমের জীবনে একটি বড় শারীরিক সংকট ও অস্ত্রোপচার আসে। মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে তিনি মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করার প্রতিজ্ঞা করেন। সেই বিশ্বাস ও মানসিক শক্তিই তাকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।.

সমালোচনা, চ্যালেঞ্জ ও টিকে থাকার লড়াই

ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হয়েছে। তবে ড. হোসনে আরা বেগমের দাবি, ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনায় বড় ধরনের মাঠ পর্যায়ের তদারকি প্রয়োজন। কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋণ দেওয়া ও আদায় করতে হয়, বিনা জামানতে দেওয়া ঋণের ব্যবস্থাপনাও কঠিন।.

তিনি বলেন, টিএমএসএস শুধু ঋণ দেয় না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে সদস্যদের পাশে থাকার চেষ্টা করে।.

ভবিষ্যতের নতুন পরিকল্পনা

ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে টিএমএসএস চালু করতে যাচ্ছে ‘ডিউ কন্ট্রোল ডোমেইন’ (DCD)। বকেয়া ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ করার লক্ষ্যে নতুন এই বিভাগ কাজ করবে।.

এক নারীর স্বপ্ন, লাখো মানুষের পরিবর্তন

ঠেঙ্গামারার সেই ছোট্ট মাটির ঘর থেকে আজকের টিএমএসএস—এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বড় হওয়ার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, আত্মমর্যাদা ফিরে পাওয়ার গল্প এবং একজন নারীর দীর্ঘ সংগ্রাম, সাহস ও মানবিকতার ইতিহাস।.

মুষ্টির চাল থেকে শুরু হওয়া সেই স্বপ্ন আজ একটি মহীরুহ—যার শিকড় রয়েছে মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসে।. .

Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ