• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ৩১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

ধানক্ষেতের আইল আর কাঁদার মাঝে বন্দি এক ‘শান্তি নিকেতন’ ও কিছু স্বপ্নের মৃত্যু!


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৫:২৩ পিএম
ধানক্ষেতের আইল আর কাঁদার মাঝে বন্দি এক ‘শান্তি নিকেতন’ ও কিছু স্বপ্নের মৃত্যু!
ছবি: প্রতিনিধি

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি:.

চারিদিকে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ধানের ক্ষেত। বাতাসে দোল খাওয়া ধানের শীষের মাঝখানে যেন একাকী দাঁড়িয়ে আছে একটি ভবন। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে কোনো শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা নিখুঁত কোনো প্রকৃতির ছবি। কিন্তু এই ছবির খুব কাছে গেলেই শোনা যায় কিছু দীর্ঘশ্বাস, দেখা যায় এক চরম অবহেলা আর বঞ্চনার গল্প।.

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নে বাঘমারা গ্রামে ৩০ শতাংশের উপর অবস্থিত এই ভবনটি কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি নয়, এটি বাঘমারা শান্তি নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নামের সাথে ‘শান্তি’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও, এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের মনে কোনো শান্তি নেই, আছে কেবলই এক বুক হতাশা।.

গ্রামের লোকালয় থেকে বেশ খানিকটা দূরে, বিস্তীর্ণ কৃষি জমির ঠিক মাঝখানে স্কুলটির অবস্থান। মির্জাপুর ও শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায়, একটি আদিবাসী গ্রামের পাশেই এর ঠিকানা। ভৌগোলিক এই প্রান্তিক অবস্থানের কারণেই কি না কে জানে, উন্নয়নের ছোঁয়া যেন সযতনে এড়িয়ে গেছে এই বিদ্যাপীঠকে।.

সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই স্কুলে যাওয়ার জন্য কোনো রাস্তা নেই! প্রতিদিন কোমলমতি শিশু আর শিক্ষকদের স্কুলে পৌঁছাতে হয় ধানক্ষেতের সরু, আঁকাবাঁকা আর বিপজ্জনক আইল ধরে। শুষ্ক মৌসুমে এই পথটুকু কোনোমতে পার হওয়া গেলেও, বৃষ্টির দিনগুলো এখানে নিয়ে আসে এক ভয়ংকর বিভীষিকা।.

বৃষ্টি হলেই ক্ষেতের আইল গলে পরিণত হয় পিচ্ছিল কাঁদায়। একটু পা হড়কালেই সোজা জল-কাদায় পূর্ণ ধানক্ষেতে। কাঁদা মেখে, বই-খাতা ভিজিয়ে, জামাকাপড় নষ্ট করে প্রতিদিন কত শিশু যে মাঝপথ থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যায়, তার কোনো হিসেব নেই। শিক্ষকদের অবস্থাও তথৈবচ। জুতো হাতে নিয়ে, প্যান্ট গুটিয়ে, একহাঁটু কাঁদা পেরিয়ে তাদের স্কুলে পৌঁছাতে হয়। যেখানে একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার কথা আনন্দ নিয়ে, সেখানে বাগমারা শান্তিনিকেতন স্কুলে যাওয়া মানেই যেন এক চরম ভোগান্তি আর যুদ্ধ! এই করুণ অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্কুলের অস্তিত্বের ওপর। এমনিতেই বর্তমান সময়ে নানা কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর থেকে অনেক অভিভাবক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তার ওপর যাতায়াতের এমন ভয়াল রূপ দেখে কোন বাবা-মা চাইবেন তার আদরের সন্তানকে কাঁদার মধ্যে ঠেলে দিতে? ফলে একদিকে যেমন প্রাথমিকে পড়ানোর প্রতি অভিভাবকদের অনীহা বাড়ছে, অন্যদিকে যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে এই স্কুলটি হারাচ্ছে তার শেষ প্রাণচাঞ্চল্যটুকুও।.

আশেপাশের আদিবাসী গ্রামগুলোর খেটে খাওয়া মানুষদের স্বপ্ন ছিল, তাদের সন্তানরা অন্তত অক্ষরজ্ঞান শিখবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু একটি রাস্তার অভাবে সেই স্বপ্নগুলো আজ ধানক্ষেতের কাঁদায় মুখ থুবড়ে পড়ছে। স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন কোনো শিক্ষক দেখেন, বৃষ্টির কারণে আজ ক্লাসরুম প্রায় ফাঁকা, তখন তার বুকের ভেতরটা কেমন করে তা কি কোনো নীতি নির্ধারক অনুভব করতে পারেন? যখন কোনো শিশু কাঁদায় পিছলে পড়ে তার নতুন বইগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হাউমাউ করে কাঁদে, সেই কান্নার শব্দ কি পৌঁছায় কর্তাব্যক্তিদের কানে? বাগমারা শান্তিনিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ যেন কেবল একটি ভবন নয়, এটি আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক নীরব প্রশ্নবোধক চিহ্ন। একটি রাস্তা, মাত্র একটি রাস্তা কি পারে না এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো স্কুলটিকে মূল স্রোতের সাথে যুক্ত করতে? পারে না কি অবহেলিত ওই শিশুগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটাতে?.

যতদিন না ধানের ক্ষেত চিরে একটি মজবুত রাস্তা এই স্কুলটির দরজায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে, ততদিন ‘শান্তি নিকেতন’ নামটি এই গ্রামের মানুষের কাছে কেবলই এক নিষ্ঠুর উপহাস হয়েই থাকবে। স্কুলটি আজ করুণ চোখে তাকিয়ে আছে, একটি পথের অপেক্ষায়, কিছু শিশুর পদচারণার অপেক্ষায়।.

এ বিষয়ে বাঘমারা শান্তি নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, আমরা খুব কষ্ট করে স্কুলে যাতায়াত করি। শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা খুব কষ্ট। শুধু রাস্তা না থাকায়। ওয়াশব্লক ও শহীদ মিনার তৈরীর সরঞ্জাম আনতে সমস্যা হয়। যার ফলে এগুলো এখন হয়নি। অন্য প্রায় সব স্কুলে হয়েছে।.

এ ব্যাপারে শিক্ষা অফিসার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, রাস্তার জন্য আবদেন প্রস্তুত করা হয়েছে। উদ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়ে.

ছে বিষটি।. .

Ajker Bogura / আব্দুল ওয়াদুদ

খোলা-কলাম বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ