• ঢাকা
  • রবিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ০১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

শুল্ক পরিবর্তনে নতুন অর্ডার নিয়ে দোদুল্যমান মার্কিন ক্রেতারা, রপ্তানি হারানোর শঙ্কায় পোশাক খা


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৪ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:১৪ এএম
শুল্ক পরিবর্তনে নতুন অর্ডার নিয়ে দোদুল্যমান মার্কিন ক্রেতারা, রপ্তানি হারানোর শঙ্কায় পোশাক খা

২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে শুল্ক কমানোর পর ইতোমধ্যে উৎপাদন বা প্রক্রিয়াধীন পণ্যের ওপর ২ শতাংশ মূল্যছাড় দাবি করছেন কয়েকজন মার্কিন ক্রেতা।.


মাত্র পাঁচ মাসের জন্য ঘোষিত ১৫ শতাংশ শুল্ক—কি থাকবে, বাতিল হবে, নাকি আরও বাড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর না মেলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা অর্ডার স্থগিত রাখছেন, বলছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। ফলে দেশের রপ্তানি প্রবাহে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান ধীরগতি।.

নতুন অর্ডার স্থগিত থাকার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করার পর— মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে আরোপিত ১৫ শতাংশ শুল্ক বিদ্যমান চালানের ক্ষেত্রেও নতুন করে দরকষাকষির জন্ম দিয়েছে।.

২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে শুল্ক কমানোর পর ইতোমধ্যে উৎপাদন বা প্রক্রিয়াধীন পণ্যের ওপর ২ শতাংশ মূল্যছাড় দাবি করছেন কয়েকজন মার্কিন ক্রেতা। রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, এতে আগেই সংকুচিত মুনাফা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।.

ক্রেতারা 'অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণে'.

অন্তত আট জন বাংলাদেশি রপ্তানিকারক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছেন, দ্রুত পরিবর্তিত বাণিজ্য নীতির কারণে মার্কিন ক্রেতারা বর্তমানে "অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ" অবস্থানে রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন বলেছেন, ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্পষ্ট দ্বিধা দেখা যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্পষ্টতা ছাড়া অর্ডারের প্রবাহ স্বাভাবিক হবে না। অর্থাৎ, মার্কিন শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত আসার আগ পর্যন্ত বাড়বে না ক্রয়াদেশ।.

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের বায়াররা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা অপেক্ষা করছে ফাইনালি ট্যারিফ রেট কী হয়। কোন ধরনের নিশ্চিয়তা ছাড়া তাদের জন্যেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা অসম্ভব।".

স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম খালেদ-ও একই রকম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র সরকার নতুন করে যে ট্যারিফ আরাপের ঘোষণা দিয়েছে, তা পরবর্তী ১৫০ দিন বা পাঁচ মাসের জন্য। ইতোমধ্যে আমাদের যেসব অর্ডার নেওয়া হয়েছে, তা আগামী জুন পর্যন্ত। কিন্তু পাঁচ মাস পর নতুন ট্যারিফ থাকবে কি-না, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে।".

"এ জন্য বায়াররা ক্রয়াদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন," –বলেন খালেদ, বছরে যার ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানির ২০ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। 
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম-ও পরিস্থিতিকে "আনপ্রেডিক্টেবল" (অনির্দেশ্য) বলে বর্ণনা করেন।.

তিনি বলেন, "চূড়ান্তভাবে শুল্কহার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে ক্রেতারা অন্ধকারে আছেন।" তার ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রেতারা এখন ন্যূনতম পরিমাণ অর্ডার দিচ্ছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের পোশাক রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।.

বাণিজ্যে শুল্ক নীতির অস্থিরতার চাপ.

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির থেমে-থেমে এই পরিবর্তন ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।.

গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ব্যবস্থায় আইনি দোলাচল পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তিনি বলেন, "একদিকে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাতিল করেছে, অন্যদিকে ট্রাম্প অন্য আইনের বলে নতুন ট্যারিফ দিয়েছে। ট্রাম্পের হাতে আরো অস্ত্র আছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পণ্য বা নির্দিষ্ট দেশের উপরও বাড়তি ট্যারিফ দিতে পারে।".

"ফলে কখন কোন দেশের উপর বা কোন পণ্যের উপর নতুন নতুন ট্যারিফ বসে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে একটা অনিশ্চয়তার কারণে সেখানকার বায়াররা দরকার না হলে অর্ডার দেবে না"– বলেন তিনি।.

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যায়।.

যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেল (ওটেক্সা)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক পণ্য আমদানি দাঁড়িয়েছে ৮.১৮ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট বৈশ্বিক পোশাক আমদানির ১১ শতাংশ।.

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেছিল। অবশ্য বাংলাদেশ পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে। অন্যদিকে যদি নতুন আরোপ হওয়া ১৫ শতাংশ ট্যারিফ সব দেশের জন্য প্রযোজ্য হয়, তাহলে বাংলাদেশ বাড়তি প্রতিযোগিতায় পড়বে বলে মনে করেন রপ্তানিকারকরা। অর্থাৎ, রপ্তানির তুলনামূলক সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ।.

এস এম খালেদ বলেন, "আগের শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের চেয়ে চীন ও ভারতের ট্যারিফ রেট (শুল্ক হার) বেশি ছিল। ফলে চীনের কিছু অর্ডার বাংলাদেশে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একই হারে ট্যারিফ হলে বাংলাদেশ আর সে সুযোগ পাবে না। ফলে সেটি আমাদের রপ্তানির জন্য কিছুটা চাপ তৈরি করবে।".

ওটেক্সার তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুনায়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছিল ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের বেড়েছিল ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর বেশিরভাগেরই রপ্তানি বেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।.

রপ্তানিকারকদের মতে, সমান শুল্ক ব্যবস্থা চালু হলে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে এই প্রবণতা উল্টে যেতে পারে।.

ক্রেতাদের থেকে মূল্যছাড়ের চাপে বায়িং হাউসগুলো.

শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে আসার পরপরই বিদ্যমান অর্ডার নিয়ে ক্রেতাদের পক্ষ থেকে পুনরায় দরকষাকষির চেষ্টা শুরু হয়েছে।.

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ন্ড এমন একটি ই-মেইল দেখেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম সারির একটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঢাকায় অবস্থিত একটি বায়িং হাউজকে ইতিমধ্যে ক্রয়াদেশ দেওয়া যেকোন পণ্যের দাম ২ শতাংশ কমানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।.

ই-মেইলে বলা হয়েছে, "সাম্প্রতিক শুল্ক পরিবর্তনের কারণে কাস্টমস ক্লিয়ার না হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে ডিডিপি (ডেলিভারি ডিউটি প্রাইস) মূল্যে ২ শতাংশ সমন্বয় প্রয়োজন।" সোমবার (যুক্তরাষ্ট্র সময়) কার্যদিবস শেষ হওয়ার আগেই এবিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতেও বলা হয়।.

ঢাকা-ভিত্তিক একটি বায়িং হাউজের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, "সাপ্লায়ারের কাছ থেকে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ নেই। যা কমাতে হয়, সেটি আমাদেরই ম্যানেজ করতে হবে।" তার প্রতিষ্ঠানের ৯০ শতাংশ চালান যুক্তরাষ্ট্রে যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।.

এর বাইরে আরো একাধিক বায়িং হাউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এসেছে শনিবার। পরদিন রবিবার ছুটির দিন থাকায় সেখানে বন্ধ ছিলো। নতুন কর্মসপ্তাহ শুরু হতেই আরও দরকষাকষির চাপ আসবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।.

মোহাম্মদ হাতেম সতর্ক করে বলেন, আরও অনেক ক্রেতা একই পথে হাঁটতে পারেন।.

তবে রপ্তানিকারকদের দাবি, ৫ শতাংশ পয়েন্ট শুল্ক হ্রাসের পুরো সুবিধা রিটেইলাররা এককভাবে নিতে পারেন না। তাদের মতে, উচ্চ শুল্কের সময় অর্ডার ধরে রাখতে প্রস্তুতকারকরা আগেই মূল্য কমিয়েছেন, তাই শুল্ক কমার সুবিধার অংশীদার হওয়ার অধিকার তাদেরও রয়েছে।.

শোভন ইসলাম জানান, তার গ্রুপ ক্রেতাদের কাছ থেকে সাশ্রয়ের অন্তত ১ শতাংশ দাবি করবে।.

অন্যদিকে খালেদ কিছুটা সংশয় প্রকাশ করে বলেন, "কম শুল্কের পুরো সুবিধাই ক্রেতারা নিজেদের পকেটে নিচ্ছেন, আমাদের কোনো ছাড় দিচ্ছেন না।".

এ মুহূর্তে ওয়াশিংটনের নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বৃহত্তম রপ্তানি বাজারের মূল্যচাপের মধ্যে আটকে রয়েছে বাংলাদেশের পোশাক খাত—এমন এক স্পষ্টতার অপেক্ষায়, যা শিগগিরই নাও আসতে পারে।. .

Ajker Bogura / Md Shourov Hossain

অর্থনীতি বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ