জ্বালানি সাশ্রয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতে কৃচ্ছ্রসাধন এবং ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর বাড়তি চাপ কমাতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে।.
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী কার্যদিবস থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত, যা পূর্বের তুলনায় এক ঘণ্টা কম। একইসঙ্গে ব্যাংকিং কার্যক্রমও নতুন সময়সূচির আওতায় আনা হয়েছে। ব্যাংকগুলো সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গ্রাহকসেবা দেবে, তবে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। সরকারের মতে, এ পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।.
এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে বাজার ও বিপণিবিতান পরিচালনার ক্ষেত্রেও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টার পর দেশের সব মার্কেট, দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখতে হবে। তবে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকানের মতো জরুরি সেবাগুলো এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, যাতে নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শিথিলতা না থাকে।.
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খাত নিয়েও সরকার পৃথকভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে শিগগিরই আলাদা নির্দেশনা জারি করবে, যা আগামী রোববার থেকে কার্যকর হতে পারে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট নিরসনে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইলেকট্রিক বাস আমদানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগে অংশ নেবে, তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। বাণিজ্যিক খাতেও নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে পুরোনো বাস আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।.
সরকারি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রেও বেশ কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের বাজেট থেকে ৩০ শতাংশ ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী তিন মাসের জন্য সরকারি কোনো নতুন গাড়ি—সড়ক, নৌ বা আকাশপথে—কেনা যাবে না এবং কম্পিউটারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়েও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের অর্ধেক স্থগিত করা হয়েছে এবং সভা-সেমিনারের আপ্যায়ন খরচও ৫০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।.
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আলোকসজ্জা নিয়েও বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ সময় কোনো ধরনের বেসরকারি বিয়ে বা উৎসব-অনুষ্ঠানে আলোকসজ্জা না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ খরচ কমানো যায়। পাশাপাশি আইনগত ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ‘পাবলিক এক্সামিনেশন অফেন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষায় অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।.
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং কাজাখস্তান থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব কমাতে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখার কথাও জানানো হয়েছে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।. .
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: