চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা এখন রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তীব্র সহিংসতার জনপদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দুই নেতার অনুসারীদের দ্বন্দ্বে গত ১৫ মাসে ২১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৫ জনই বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব হত্যার অন্তত ১৫টি সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধের ফল। একই সময়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ, যা সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কোনো একক উপজেলায় রাজনৈতিক সহিংসতার বিচারে সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।.
.
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু মাঠে ফেরার পর পুরোনো দ্বন্দ্ব নতুন করে মাথাচাড়া দেয়। ইউনিয়ন থেকে বাজার—রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিটি ক্ষেত্র দুই গ্রুপের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাউজানে এখন রাজনীতি মানেই আতঙ্ক; গুলির শব্দ, হামলা ও পাল্টা হামলা যেন নিত্যদিনের ঘটনা।.
.
এই সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা—বর্তমান সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকার। উভয় পক্ষই এলাকায় নিজেদের প্রভাব সুসংহত করতে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় বছরে টার্গেট কিলিং, মোটরসাইকেল স্কোয়াডের হামলা ও প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের মতো ঘটনা নিয়মিত রূপ নিয়েছে।.
.
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই গ্রুপই রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করতে অস্ত্র সংগ্রহ ও লোকবল বাড়িয়েছে। এলাকাভিত্তিক সশস্ত্র টিম গড়ে তোলার ফলে ছোটখাটো বিরোধও দ্রুত প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে দুই পক্ষই থানা পুলিশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ফলে কিছু হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ধীরগতি ও অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে, যা জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।.
.
রাউজানের সাম্প্রতিক সহিংসতার একটি ভয়াবহ দিক হলো পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং। অন্তত চারটি ঘটনায় একই ধরনের কৌশল লক্ষ্য করেছে পুলিশ। দুই বা তিনজন মুখোশধারী একটি মোটরসাইকেলে এসে লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিত করে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গুলি চালিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, এটি প্রশিক্ষিত ‘হিট সিস্টেম’-এর অংশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীদের কাছে ভেতরের তথ্য থাকে—কে কখন কোথায় অবস্থান করছে, সবকিছু আগে থেকেই তাদের জানা থাকে।.
.
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কয়েকটি হত্যাকাণ্ড পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের অল্প দূরত্বে সংঘটিত হলেও হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ গত বুধবার রাতে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলিমিয়া হাটবাজারে যুবদল নেতা মুহাম্মদ আবদুল মজিদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাজার থেকে মাত্র পাঁচশ মিটার দূরে পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থাকলেও মুখোশধারী হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় নাঈম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।.
.
এর আগে একই ইউনিয়নে জানুয়ারি মাসে যুবদল নেতা জানে আলম সিকদারকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। গত বছরের অক্টোবরেও রাউজান পৌরসভার একটি এলাকায় যুবদল কর্মী আলমগীর আলম এবং হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মী আবদুল হাকিম গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপজেলায়।.
.
স্থানীয় সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পর এলাকায় নতুন করে আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার ঘটেছে। বিদেশি পিস্তল, রিভলভার, দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেল থেকে ব্যবহারের উপযোগী হালকা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।.
.
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। অনেক আসামি ঘটনা ঘটিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার সম্ভব হয় না, তবে প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।.
.
এদিকে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকার উভয়েই প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার এই চক্র ভাঙা না গেলে রাউজানে সহিংসতার অবসান সহজ হবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।. .
Ajker Bogura / ডেস্ক রিপোর্ট
আপনার মতামত লিখুন: