বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসনকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও জনমুখী করতে বিকেন্দ্রীকরণের বিকল্প নেই। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ এবং প্রশাসনিক চাপের বাস্তবতায় নতুন শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা বগুড়ায় একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠার দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। বগুড়া শুধু একটি জেলা নয়; এটি উত্তরবঙ্গের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরেই বগুড়া উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, একাডেমিক কার্যক্রম, ভর্তি কোচিং, প্রশাসনিক সেবা ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে আসছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই বগুড়া উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত। সরকারি আজিজুল হক কলেজ, সরকারি শাহ সুলতান কলেজ, বগুড়া জিলা স্কুল, বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলসহ অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই জেলার শিক্ষাগত সক্ষমতাকে বহু আগেই প্রমাণ করেছে। প্রতি বছর মেডিকেল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বগুড়ার শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে আসছে। ফলে শিক্ষা অবকাঠামো, মেধা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার বিচারে বগুড়া একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবোর্ড পরিচালনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বর্তমানে বগুড়া রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। সনদ সংশোধন, ফলাফল সংক্রান্ত জটিলতা, খাতা পুনঃনিরীক্ষণ, কলেজ স্বীকৃতি কিংবা অন্যান্য জরুরি কাজের জন্য বহু শিক্ষার্থীকে দূরবর্তী রাজশাহীতে যেতে হয়, যা সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই কষ্টসাধ্য। রাজশাহী বোর্ডের অধীনে বহু জেলা থাকায় প্রশাসনিক চাপও অত্যন্ত বেশি, ফলে সেবার গতি কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। বগুড়ায় নতুন শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হলে শুধু রাজশাহী বোর্ডের চাপ কমবে না, বরং উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা আরও গতিশীল, দ্রুত ও দক্ষ হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও বগুড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকায় উত্তরবঙ্গের প্রায় সব জেলার সঙ্গে বগুড়ার সহজ ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। রংপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীদের জন্য বগুড়া একটি সহজলভ্য প্রশাসনিক কেন্দ্র হতে পারে। এছাড়া বগুড়ায় পর্যাপ্ত নগর সুবিধা, সরকারি অবকাঠামো, শিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞ জনবল এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে, যা একটি নতুন শিক্ষাবোর্ড পরিচালনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। একটি শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা শুধু শিক্ষা প্রশাসনের উন্নয়ন নয়; এটি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, সরকারি কার্যক্রম সম্প্রসারিত হবে, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে এবং উত্তরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার হবে। অনেকেই মনে করেন বিভাগীয় শহর না হলে শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, কিন্তু বাস্তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভাগীয় মর্যাদা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বগুড়া দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের অঘোষিত রাজধানী হিসেবে পরিচিত এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, যোগাযোগ ও জনসংখ্যার বিচারে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী জেলা। তাই বগুড়ায় শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়; বরং এটি উত্তরবঙ্গের লাখো শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের ন্যায্য অধিকার। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, দ্রুত ও জনবান্ধব করতে সরকারের উচিত বগুড়ায় একটি স্বতন্ত্র মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। কারণ বগুড়ায় শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা মানে শুধু একটি নতুন প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ নয়, বরং উত্তরবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা, নতুন গতি এবং নতুন যুগের সূচনা।.
.
লেখা: সামসিল আরিফিন. .
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: