বগুড়ায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, ছোটখাটো বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে কেন্দ্র করে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা জড়িয়ে পড়ছে সহিংসতায়। ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার, হামলা, ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।.
স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় যেসব বিরোধ কথার মাধ্যমে মিটে যেত, এখন সেসব ঘটনায় ব্যবহার হচ্ছে ছুরি ও দেশীয় অস্ত্র। ফলে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।.
গত ৩১ মে রাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন তরুণ ফটোগ্রাফার ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ। অভিযোগ, মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন কিশোর তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছুরিকাঘাত করে।.
নিজ বাড়ির সামনেই ঘটে এই ঘটনা। হামলার পর চিকিৎসা নিলেও এখনও সেই আঘাতের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।.
স্নিগ্ধ বলেন,
“আমি এখনও জানি না আমার অপরাধ কী ছিল। কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে কষ্ট হয়।”.
ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লেও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার নিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার প্রশ্ন তুলেছে।.
কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতার আরেকটি মর্মান্তিক উদাহরণ স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম। গত ১৭ এপ্রিল বগুড়া শহরের শাকপালা এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে নিহত হয় সে।.
সিয়াম ছিল পরিবারের একমাত্র সন্তান। তার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে পরিবার। দিনমজুর মা এখনও সন্তানের বই-খাতা ও স্কুলের পোশাকের মধ্যে তাকে খুঁজে ফেরেন।.
সিয়ামের মা বলেন,
“আমার ছেলেকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু বিচার চাই, যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।”.
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, শুধু বগুড়া শহরেই প্রায় ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব গ্রুপের পেছনে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত অপরাধীর নেতৃত্ব রয়েছে বলে জানা গেছে।.
তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।.
গত বছরের ২৬ জুলাই বগুড়া শহরের বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে জেলা পুলিশ ৮১০টি বার্মিজ ও চায়নিজ চাকু উদ্ধার করেছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন অনেকে।.
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ছোট সদস্যদের আটক করলেই হবে না; যারা এসব গ্যাং পরিচালনা করছে বা পেছন থেকে সহযোগিতা করছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।.
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বগুড়ায় ৪৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৯টি।.
একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১০০ জন।.
সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা কামাল সরকার বলেন, কিশোর গ্যাং এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।.
বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল বাছেদ বলেন, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। শাস্তি নিশ্চিত হলে অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা কমবে।.
বগুড়া জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইনচার্জ ইকবাল বাহার জানান, শহরে একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।.
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া মুখপাত্র) আতোয়ার রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।.
বিশ্লেষকদের মতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান নয়—পরিবারের নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর করা জরুরি।. .
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: