ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো যাকাত, যা মুসলিম সমাজে সম্পদের ভারসাম্য ও দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। চার প্রকারের সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়। যার বিবরণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—.
ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্য-ফসল ও ফল-ফলাদীর ওপর যাকাত ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন—.
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَنفِقُواْ مِن طَيِّبَٰتِ مَا كَسَبۡتُمۡ وَمِمَّآ أَخۡرَجۡنَا لَكُم مِّنَ ٱلۡأَرۡضِۖ.
‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের বৈধ উপার্জন এবং আমরা তোমাদের জন্য ভুমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন করি তা থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় কর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৬৭).
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন—.
وَءَاتُواْ حَقَّهُۥ يَوۡمَ حَصَادِهِۦۖ.
‘আর তোমরা ফসল কাটার সময় তার হক (যাকাত) আদায় কর।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ১৪১).
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—.
فِيمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالعُيُونُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا العُشْرُ، وَمَا سُقِيَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ العُشْرِ..
‘আসমান ও ঝর্ণার পানিতে কিংবা স্বেচ্ছা উৎপাদিত ফসলের মধ্যে এক দশমাংশ আর যা সেচের মাধ্যমে আবাদ হয় তার মধ্যে বিশভাগের এক ভাগ যাকাত প্রদেয়।’ (বুখারি ১৪৮৩).
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—.
لَيْسَ فِي حَبٍّ وَلَا ثَمَرٍ صَدَقَةٌ، حَتَّى يَبْلُغَ خَمْسَةَ أَوْسقٍ..
‘শস্য বা ফলমুলের ওপর যাকাত ফরজ হবে না, যতক্ষণ তা পাঁচ ওসক পরিমাণ না হয়।’ (মুসলিম ৯৭৯).
ওসকের পরিমাণ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যবহৃত সা‘ এর ৬০ সা‘ সমপরিমাণ। তাহলে নিসাব হলো তিনশ সা‘। এক সা‘র পরিমাণ প্রায় ২০৪০ গ্রাম (দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম)। সুতরাং ফসলের নিসাবের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬১২ কেজি। তাই ৬১২ কেজির কম ফসলের ওপর যাকাত ফরজ নয়।.
কারও যদি ৬১২ কেজি বা তার বেশি ফসল হয় এবং তা যদি বিনাশ্রমে (বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক পানিতে) উৎপন্ন হয়, তবে যাকাতের পরিমাণ এক দশমাংশ (১০%)। আর যদি সেচ বা শ্রম ব্যয়ে উৎপাদিত হয়, তবে এক বিশমাংশ (৫%)।.
শাক-সবজি, তরমুজ ও এ জাতীয় দ্রুত নষ্ট হয় এমন ফসলের ওপর সরাসরি যাকাত ফরজ নয়। তবে সেগুলো বিক্রি করে অর্থ জমা হলে এবং তা নিসাব পরিমাণ হয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হয়, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে।.
উট, গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া—যদি এগুলো ‘সায়েমা’ হয় অর্থাৎ বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে ঘাস খেয়ে বেড়ায় এবং বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পালন করা হয়, তাহলে যাকাত ফরজ হবে।.
নিসাবের পরিমাণ:.
যদি এসব প্রাণী ঘাস কেটে খাওয়ানো হয় এবং ব্যবসার উদ্দেশ্য না থাকে, তবে যাকাত ফরজ নয়। তবে যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে পালন করা হয়, তাহলে ব্যবসায়িক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তার বাজারমূল্যের ওপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে।.
আল্লাহ তাআলা বলেন—.
وَٱلَّذِينَ يَكۡنِزُونَ ٱلذَّهَبَ وَٱلۡفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ فَبَشِّرۡهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٖ....
(সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৩৪–৩৫).
স্বর্ণ ও রূপার নিসাব পূর্ণ হলে সর্বাবস্থায় যাকাত ফরজ।.
২০ দিনার ≈ ৮৫ গ্রাম (প্রায় ৭.৫ ভরি).
২০০ দিরহাম ≈ ৫৯৫ গ্রাম (প্রায় ৫২.৫ ভরি).
যদি এক বছর পূর্ণ হয় (হাওল), তাহলে মোট সম্পদের ওপর ২.৫% (৪০ ভাগের এক ভাগ) যাকাত দিতে হবে।.
অলংকার পরিধেয় হোক বা সঞ্চিত—নিসাব পূর্ণ হলে যাকাত দিতে হবে।.
যে সব বস্তু মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়—যেমন জমি, দোকানের পণ্য, গবাদিপশু (ব্যবসার জন্য), গাড়ি, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি—সবই ব্যবসায়িক সম্পদ।.
বছর শেষে সব পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করে মোট মূল্যের ওপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে।.
মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিস যেমন—.
এসবের ওপর যাকাত নেই।.
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—.
لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ فِى عَبْدِهِ وَلاَ فَرَسِهِ صَدَقَةٌ..
‘মুসলিমের দাস-দাসী ও ঘোড়ার ওপর যাকাত নেই।’ (বুখারি ১৪৬৪, মুসলিম ৯৮২).
যাকাত ফরজ হয় চার প্রকার সম্পদের ওপর—.
১. কৃষিজ উৎপাদন
২. নির্দিষ্ট গবাদিপশু
৩. স্বর্ণ-রূপা ও নগদ অর্থ
৪. ব্যবসায়িক পণ্য.
নিসাব পূর্ণ হয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হলে (কৃষিজ ফসল ছাড়া) মোট সম্পদের ২.৫% যাকাত আদায় করা ফরজ।.
যাকাত আদায় করলে সম্পদ পবিত্র হয় এবং সমাজে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।. .
Ajker Bogura / ডেস্ক রিপোর্ট
আপনার মতামত লিখুন: