• ঢাকা
  • রবিবার, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ১৫ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ফ্লাইট বাতিল–স্থগিত, বড় ধাক্কা দেশের বিমান ও হোটেল খাতে


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:৩৭ এএম
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ফ্লাইট বাতিল–স্থগিত, বড় ধাক্কা দেশের বিমান ও হোটেল খাতে
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ফ্লাইট বাতিল–স্থগিত, বড় ধাক্কা দেশের বিমান ও হোটেল খাতে

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ফ্লাইট চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় গত দুই সপ্তাহে বিমান পরিবহন ও আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) খাতে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।.

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এতে পুরো অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটে।.

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে গতকাল (১৩ মার্চ) পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী ৮৯৫টি নির্ধারিত ফ্লাইটের মধ্যে প্রায় ৪৪৭টি বাতিল হয়েছে।.

বিমানবন্দর কর্মকর্তারা জানান, বাতিল ফ্লাইটগুলো মোট নির্ধারিত ফ্লাইটের ২০ শতাংশেরও বেশি। এতে যাত্রীরা বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছেন, পাশাপাশি এয়ারলাইন্স, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভ্রমণসংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোর আয়ও কমে যাচ্ছে।.

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পূর্ণ আর্থিক প্রভাব এখনো নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ফ্লাইট বিঘ্ন অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে এবং পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।.

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি খাতে ছড়িয়ে পড়বে।.

তিনি বলেন, "যাত্রীসংখ্যা কমে গেলে সরাসরি বিমানবন্দরের আয় কমে যায়। পাশাপাশি হোটেলরুম ভাড়া, রেস্তোরাঁ এবং সড়ক পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।".

তিনি আরও বলেন, "বিমান সংস্থার ক্রুরাও হোটেলে থাকেন। ফলে ফ্লাইট বাতিল হলে এর প্রভাব একাধিক সেবাখাতে ছড়িয়ে পড়ে।".

তিনি জানান, প্রতি ফ্লাইটে গড়ে প্রায় ২৫০ জন যাত্রী থাকেন। ফলে এভাবে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় পুরো শিল্পে সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।.

ফ্লাইট বাতিলে যাত্রী ও আয় হারাচ্ছে এয়ারলাইন্স.

মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এয়ারলাইন্সগুলো বড় ধরনের আয় হারাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।.

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইট কমে যাওয়ায় প্রতিদিন শত শত ফিরতিযাত্রী হারাচ্ছে সংস্থাটি।.

কামরুল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন সাধারণত যে যাত্রীরা ফিরতেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ জনকে আমরা এখন হারাচ্ছি।".

গড়ে ওয়ানওয়ে বা একমুখী ফ্লাইটের ভাড়া প্রায় ৫০ হাজার টাকা হওয়ায় প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে এয়ারলাইন্সটি।.

সংকট শুরুর পর থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রায় ৩০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তবে রিফান্ড ও পুনঃতফসিলের প্রক্রিয়া চলমান থাকায় মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।.

ফ্লাইট বিঘ্নের আগে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে একাধিক ফ্লাইট পরিচালনা করত। বর্তমানে শারজাহ ও আবুধাবিগামী ফ্লাইট স্থগিত রয়েছে, পাশাপাশি কাতারগামী ফ্লাইটও বন্ধ রাখা হয়েছে।.

ইউএস-বাংলা জানিয়েছে, আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে শারজাহ এবং ১৪ এপ্রিল থেকে আবুধাবিগামী ফ্লাইট পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।.

বৈশ্বিক বিমান চলাচলেও পড়েছে প্রভাব.

উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বড় বিমান ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করে—যেখানে এশিয়া, আফ্রিকা  ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীরা সংযোগ ফ্লাইট নেন।.

সংকটের আগে দুবাই, আবুধাবি ও দোহা বিমানবন্দরগুলো ছিল বৈশ্বিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।.

দ্য গার্ডিয়ানের ৭ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ যাত্রী এসব হাবের একটি দিয়ে যাতায়াত করেন। তাদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ট্রানজিট যাত্রী।.

আকাশসীমা বন্ধ হয়ে এসব হাবের মাধ্যমে চলাচলকারী ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ায় এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক বিমান চলাচল ব্যবস্থাতেও। এতে বহু যাত্রী আটকে পড়েছেন এবং অনেককে তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে।.

এই প্রভাব বাংলাদেশে বিশেষভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের বড় একটি অংশ সংযোগ ফ্লাইটের জন্য এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের মতো উপসাগরীয় বিমান সংস্থার ওপর নির্ভর করেন।.

দেশীয় এয়ারলাইন্সেও চাপ.

ঢাকা হয়ে ট্রানজিট যাত্রী কমে যাওয়ায় দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোও চাপের মুখে পড়েছে।.

রাজধানীর বাইরে থেকে অনেক যাত্রী সাধারণত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরতে আগে ঢাকা পর্যন্ত ডোমেস্টিক ফ্লাইটে আসেন। তবে উপসাগরীয় হাবগুলোর মাধ্যমে ফ্লাইট কমে যাওয়ায় এসব ফিডার রুটেও চাহিদা কমেছে।.

নভোএয়ারের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের পরিচালক সোহেল মজিদ বলেন, সিলেট রুটে টিকিট বাতিলের সংখ্যা বেড়ে গেছে।.

তিনি বলেন, "এখন সিলেটের প্রতিটি ফ্লাইটে ২০ থেকে ২৫টি করে রিফান্ড হচ্ছে, যা আমাদের মোট যাত্রীর প্রায় ৪০ শতাংশ।".

তবে মজিদ জানান, বর্তমানে কক্সবাজার, সিলেট, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রাম—এই সীমিত রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করায় তাদের ওপর সামগ্রিক প্রভাব এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে।.

বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের  আয় কমছে.

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাধারণত প্রতিদিন ১৯০ থেকে ৩০০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে এবং প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।.

সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩২টি ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে।.

প্রতি ফ্লাইটে গড়ে প্রায় ২৫০ জন যাত্রী ধরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৮ হাজার যাত্রী কমে গেছে।.

প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক উৎস থেকে আয় করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে অবতরণ ও পার্কিং ফি, নেভিগেশন চার্জ, যাত্রী সেবা ফি, নিরাপত্তা ফি এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ।.

বাংলাদেশে সব বিদেশি এয়ারলাইন্সকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফলে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল কমে যাওয়ায় জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থাটি সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়েছে।.

মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি রুটে ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে হয়েছে বিমানকে। তবে ১২ মার্চ অন্তত দুটি রুটে আংশিকভাবে ফ্লাইট চালু হয়।.

বিমানের মুখপাত্র বুশরা ইসলাম বলেন, এতে সংস্থাটি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং আয় এবং টিকিট বিক্রি—উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতির মুখে পড়ছে।.

তিনি বলেন, "রিফান্ড ও রিশিডিউল  প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় পূর্ণ আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করতে কিছুটা সময় লাগবে।".

শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ঢাকার বিমানবন্দরে একটি ন্যারোবডি উড়োজাহাজের জন্য স্বাভাবিক টার্নঅ্যারাউন্ডে বিভিন্ন চার্জ মিলিয়ে এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রায় ৭ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হয়। আর ওয়াইডবডি উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে এই খরচ প্রায় ১২ হাজার ডলার।.

এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।.

সরকারের রাজস্ব আয়ও কমেছে। কারণ আন্তর্জাতিক প্রত্যেক যাত্রী দেশ ছাড়ার সময় সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ ডলার পর্যন্ত ট্রাভেল ট্যাক্স, এমবারকেশন ফি, নিরাপত্তা চার্জ ও আবগারি শুল্ক পরিশোধ করেন।.

ঢাকা বিমানবন্দরের নির্বাহী গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনো সামগ্রিক প্রভাব মূল্যায়ন করছে।.

তিনি বলেন, "যাত্রী ও এয়ারলাইন্স—উভয় দিক থেকেই আমাদের রাজস্ব কমছে।".

হোটেল খাতেও পড়েছে প্রভাব.

ফ্লাইট বাতিল ও বুকিং কমে যাওয়ায় হোটেল খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।.

শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত ঈদের আগে পাঁচতারকা হোটেলগুলোতে বুকিংয়ের চাপ বেশি থাকে। তবে এখন বুকিং ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।.

উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীরা হোটেল খাতের মোট অতিথিদের বড় অংশ না হলেও, এই খাতটি মধ্যপ্রাচ্যের হাব হয়ে আসা আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রীদের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।.

ফ্লাইট কমে যাওয়ায় উপসাগরীয় এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে আসা ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যাও কমেছে—যার প্রভাব পড়েছে হোটেলের বুকিং ও অকুপেন্সিতে।.

গুলশানের একটি পাঁচতারকা হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার জানান, এই সংকটের কারণে তাৎক্ষণিক বুকিং বাতিলের পাশাপাশি ভবিষ্যতের বুকিংও কমে গেছে।.

তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনে শুধু ওই হোটেলটিরই প্রায় ৭০ লাখ টাকার বুকিং বাতিল হয়েছে—যা তাদের সম্ভাব্য মাসিক আয়ের প্রায় ১০ শতাংশের সমান।.

এদিকে র‍্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হোটেলটির অকুপেন্সির হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।. .

Ajker Bogura / Md Shourov Hossain

অর্থনীতি বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ