নিজস্ব প্রতিবেদক.
স্বপ্ন ছিল ব্যাংকের চাকরি করার, কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা বদলে দিয়েছে পথ। সেই পথেই আজ সফলতার গল্প লিখেছেন বগুড়ার নারী উদ্যোক্তা তানিয়া আক্তার। ঘরে তৈরি আচার দিয়ে শুরু করা তাঁর ছোট উদ্যোগ এখন পৌঁছে গেছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে।.
বগুড়ার সেন্ট্রাল হাই স্কুল থেকে ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে কমার্শিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তানিয়া। পরবর্তীতে সরকারি আজিজুল হক কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন তিনি।.
২০১১ সালে ব্যবসায়ী মো. আদনান হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তানিয়া। ভালোই চলছিল সংসার। তবে ২০১৮ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন স্বামী আদনান। বদলে যায় পুরো পরিবারের চিত্র। স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন তানিয়া।.
মাত্র ৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন আচারের ব্যবসা। প্রথমদিকে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সৌদি আরব প্রবাসীর কাছ থেকে আসে অর্ডার। ২ কেজি বড়ইয়ের আচার তৈরি করে পাঠানোর পর প্রবাসে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। সেই সাফল্যই তাঁকে নতুন স্বপ্ন দেখায়।.
এরপর মেয়ের নাম অনুসারে ফেসবুকভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আরিয়ানাস ড্রিমস’ শুরু করেন তানিয়া। নিজের ঘরে তৈরি করতে থাকেন বিভিন্ন ধরনের আচার। ধীরে ধীরে তাঁর পণ্যের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়াতেও।.
তবে সফলতার পথ সহজ ছিল না। স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে একদিকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি করেছেন, অন্যদিকে রাত জেগে তৈরি করেছেন আচার। পরে আচারের পাশাপাশি কেক, পেটিস ও পিজ্জা তৈরির কাজও শুরু করেন।.
ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিতে বিসিক ও গাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং, উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ নানা প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০২৪ সালে গাক থেকে ১৫ হাজার টাকা অনুদান এবং ২০২৫ সালে একটি ক্রিম সেপারেশন মেশিন পান। বর্তমানে সেই মেশিনের মাধ্যমে ঘি উৎপাদন করছেন।.
তানিয়ার ‘আরিয়ানাস ড্রিমস’ এখন আচার, ঘি ও বিভিন্ন ঘরোয়া খাদ্যপণ্যের পরিচিত একটি নাম। আম, বরই, তেঁতুল, চালতা, জলপাই, রসুন, মরিচ, মিক্সড আচারসহ গরু ও মুরগির মাংসের আচারও তৈরি করেন তিনি।.
বর্তমানে তাঁর পণ্যের মধ্যে আমের আচার প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, বরই ও তেঁতুলের আচার ৬০০ টাকা, রসুনের আচার ৭০০ টাকা, মিক্সড আচার ৭০০ টাকা, মরিচের আচার ৫০০ টাকা এবং গরুর মাংসের আচার ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।.
৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করা সেই উদ্যোগ ৮ বছরের ব্যবধানে এখন প্রায় ৪ লাখ টাকার পুঁজিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ৩ জন কর্মী। শুরুতে নিজেই পণ্য পৌঁছে দিলেও এখন রয়েছে নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থা।.
বগুড়ার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁর নিয়মিত ক্রেতা। দেশের পাশাপাশি প্রবাসীদের হাত ধরে বিদেশেও পৌঁছে যাচ্ছে তাঁর তৈরি পণ্য।.
সংসার, ব্যবসা ও পরিবারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাচ্ছেন তানিয়া। অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা এবং মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্বও পালন করছেন তিনি।.
তানিয়া জানান, বর্তমানে কাঁচামাল, তেল ও মসলার দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায় কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।.
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তানিয়া বলেন, অনলাইন ব্যবসার পাশাপাশি বগুড়া শহরে একটি শোরুম চালু করতে চান। সেখানে আরও ৫ থেকে ১০ জন নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সরাসরি বিদেশে আচার রপ্তানি করার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছেন তিনি।.
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তানিয়ার পরামর্শ—অন্যকে অনুসরণ না করে নিজের দক্ষতা ও ভালো লাগার জায়গা খুঁজে নিয়ে পরিশ্রম করলে সফলতা আসবেই।.
তথ্য : আলোকিত প্রতিদিন.
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: