রাতে বগুড়া শহরের কোন এলাকায় মানুষ বেশি নিরাপত্তাহীন অনুভব করে—এটা একেকজনের অভিজ্ঞতা, সময়, পরিস্থিতি ও চলাফেরার ওপর নির্ভর করে। তবে স্থানীয়দের অভিজ্ঞতা, সংবাদ প্রতিবেদন, অপরাধের ধরন এবং শহরের পরিবেশ বিবেচনায় কিছু এলাকা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বগুড়ায় ছিনতাই, চুরি, কিশোর গ্যাং ও খুনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বলেও বিভিন্ন সংবাদে উঠে এসেছে। .
বগুড়া শহরের রাতের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা.
বগুড়া উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ শহর। দিনে শহরটি যতটা প্রাণবন্ত, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু এলাকায় মানুষের ভয় ও সতর্কতা ততটাই বাড়ে। বিশেষ করে রাত ১০টার পর নির্জন রাস্তা, কম আলো, অলিগলি, মাদকসেবীদের আড্ডা এবং টহল কম থাকার কারণে কিছু স্থানে মানুষ একা চলাফেরা এড়িয়ে চলে।.
সাতমাথা ও আশপাশ.
সাতমাথা বগুড়ার কেন্দ্রবিন্দু। দিনে অত্যন্ত ব্যস্ত হলেও গভীর রাতে পরিবেশ বদলে যায়। দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে আশপাশের কিছু গলি ও অন্ধকার অংশে ছিনতাইয়ের আশঙ্কা নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। বিশেষ করে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে হাঁটা বা একা রিকশায় চলাচল করলে সতর্ক থাকতে হয়।.
তবে পুলিশের উপস্থিতিও এই এলাকায় তুলনামূলক বেশি থাকে, তাই একেবারে “অসুরক্ষিত” বলা যায় না। বরং গভীর রাতে ফাঁকা হয়ে যাওয়াটাই মূল সমস্যা।.
কলোনি এলাকা.
কলোনি এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আলোচনায় আসে। স্থানীয়দের অনেকে রাতের বেলা এই এলাকায় একা প্রবেশ করতে স্বস্তি পান না। বিশেষ করে অপরিচিত কেউ গেলে ঝুঁকি বেশি মনে করা হয়।.
কিছু গলিতে পর্যাপ্ত আলো না থাকা এবং মাদকসংক্রান্ত ছোটখাটো সংঘবদ্ধ গ্রুপের উপস্থিতির অভিযোগ মাঝে মাঝে শোনা যায়। যদিও পুরো এলাকাকে একইভাবে বিচার করা ঠিক নয়, কারণ অনেক সাধারণ পরিবারও এখানে বসবাস করে।.
নিশিন্দারা.
নিশিন্দারা দ্রুত বর্ধনশীল এলাকা। কিন্তু কিছু অংশে রাতের বেলা কিশোর গ্যাং, মারামারি ও মাদক নিয়ে আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক খুনের ঘটনাও এই এলাকার নাম আলোচনায় এনেছে। .
বিশেষ করে গভীর রাতে নির্জন রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেলে চলাচলকারীরা মাঝে মাঝে ভয় পান বলে স্থানীয়দের অনেকে উল্লেখ করেন।.
বনানী এলাকা.
বনানী তুলনামূলক আধুনিক ও ব্যস্ত এলাকা হলেও রাতের পর কিছু অংশ নির্জন হয়ে যায়। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সড়ক ও কম আলোযুক্ত অংশে নারীরা একা চলতে স্বস্তি পান না—এমন অভিযোগ শোনা যায়।.
তবে শহরের অন্য অনেক এলাকার তুলনায় এখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা ভালো বলেও অনেকে মনে করেন।.
ফুলবাড়ী ও রেললাইন সংলগ্ন এলাকা.
ফুলবাড়ী ও আশপাশের রেললাইন এলাকাগুলোতে রাত গভীর হলে মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের আনাগোনা নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রেললাইনের ধারে অন্ধকার অংশগুলোতে ছিনতাইয়ের ভয় বেশি থাকে বলে ধারণা রয়েছে।.
বিশেষ করে একা পথচারী বা অটোরিকশায় একা যাত্রী হলে বেশি সতর্ক থাকতে বলা হয়।.
ঠনঠনিয়া ও পুরান বগুড়া.
ঠনঠনিয়া এবং পুরান শহরের কিছু সরু গলিতে গভীর রাতে চলাচল অনেকেই এড়িয়ে চলেন। কারণ এসব এলাকায় রাস্তা সংকীর্ণ, কিছু অংশে পর্যাপ্ত আলো নেই এবং দ্রুত সাহায্য পাওয়া কঠিন হতে পারে।.
তবে এখানকার মানুষজন অনেক ক্ষেত্রে পরিচিত হওয়ায় স্থানীয়রা তুলনামূলক স্বস্তি অনুভব করেন, কিন্তু বাইরের লোকদের জন্য পরিবেশ ভিন্ন হতে পারে।.
চারমাথা ও মহাসড়ক সংলগ্ন অংশ.
চারমাথা শহরের প্রবেশমুখ হওয়ায় সারাক্ষণ যানবাহন চলাচল থাকে। কিন্তু গভীর রাতে ট্রাক টার্মিনাল, গ্যারেজ ও ফাঁকা অংশগুলোতে ঝুঁকি অনুভব করেন অনেকে। বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রী বা একা পথচারীদের সতর্ক থাকতে হয়।.
চেলোপাড়া ও মালতিনগর.
চেলোপাড়া এবং মালতিনগর এলাকায় কিছু স্থানে রাতের পর বখাটে ও মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের উৎপাত নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়। বিশেষ করে তরুণদের আড্ডা ও দ্রুতগতির বাইক চলাচলের কারণে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন।.
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা.
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় সারারাত মানুষ চলাচল থাকলেও আশপাশের কিছু অন্ধকার অংশে ছিনতাইয়ের অভিযোগ আগে শোনা গেছে। রোগীর স্বজনদের অনেক সময় গভীর রাতে অসহায় অবস্থায় থাকতে হয়।.
কেন মানুষ নিরাপত্তাহীন অনুভব করে?.
বগুড়া শহরের ক্ষেত্রে কয়েকটি কারণ বেশি আলোচিত—.
পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট না থাকা.
গভীর রাতে পুলিশ টহল কম মনে হওয়া.
কিশোর গ্যাং সমস্যা.
মাদকসেবী ও ছিনতাইকারী চক্র.
ফাঁকা রাস্তা ও কম জনসমাগম.
মোটরসাইকেলভিত্তিক ছিনতাই.
সিসিটিভির সীমিত ব্যবহার.
যদিও শহরে সিসিটিভি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। .
কোন এলাকাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হয়?.
অনেকের মতে নিচের এলাকাগুলো তুলনামূলক বেশি নিরাপদ অনুভূত হয়—.
বনানীর আবাসিক অংশ.
সরকারি অফিসপাড়া.
সাতমাথার মূল অংশ.
জিলা স্কুল রোড.
পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন এলাকা.
ব্যস্ত মার্কেট এলাকা.
কারণ এসব স্থানে আলো, মানুষের উপস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি তুলনামূলক বেশি থাকে।.
নারীদের জন্য বাস্তবতা.
বগুড়ার অনেক নারী রাতের পর একা রিকশা বা অটোতে চলাচল করতে অস্বস্তি অনুভব করেন। বিশেষ করে নির্জন রাস্তা, অশালীন মন্তব্য, মোটরসাইকেলে অনুসরণ করা—এসব নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। তাই বেশিরভাগ পরিবার রাতের পর একা বের হতে নিরুৎসাহিত করে।.
সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা.
বাস্তবে একই এলাকায় একজন নিরাপদ বোধ করলেও অন্যজন ভয় পেতে পারেন। কেউ ২০ বছর ধরে কোনো সমস্যায় পড়েননি, আবার কেউ একবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। তাই পুরো এলাকাকে “খারাপ” বা “ভয়ংকর” বলা পুরোপুরি সঠিক নয়।.
নিরাপদ থাকার কিছু বাস্তব পরামর্শ.
গভীর রাতে একা নির্জন রাস্তা এড়িয়ে চলা.
ফোন ব্যবহার করতে করতে হাঁটা না.
শর্টকাট গলি এড়ানো.
প্রয়োজনে পরিচিত রিকশাচালক ব্যবহার করা.
জরুরি নম্বর ৯৯৯ সংরক্ষণ রাখা.
মোটরসাইকেলে অপরিচিত কাউকে বিশ্বাস না করা.
নগদ টাকা কম বহন করা.
বগুড়া এখনও বাংলাদেশের তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ ও বাসযোগ্য শহরগুলোর একটি। তবে অন্যান্য শহরের মতো এখানেও রাতের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। .
.
স্টাফ রিপোর্টার: সামসিল আরিফিন.
Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ
আপনার মতামত লিখুন: