চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে দেশে নয়বার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন টের পেয়েছেন মানুষ। যদিও এসব কম্পনের বেশিরভাগই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়নি, তবে ঘনঘন ভূমিকম্প বড় কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস কিনা—সে প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এরই মধ্যে আজ আবার দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে নতুন করে কেঁপে ওঠে দেশ, ফলে ফেব্রুয়ারির হিসাব দাঁড়াল অন্তত নয়বার কম্পনের ঘটনায়।.
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে একটি জটিল টেকটোনিক অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয় প্লেট, বার্মা (মিয়ানমার) মাইক্রোপ্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে ভূত্বকের নিচে ক্রমাগত চাপ সঞ্চিত হয়। এই চাপ হঠাৎ মুক্তি পেলেই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট ছোট কম্পন কখনও জমে থাকা শক্তি ধীরে ধীরে নিঃসরিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, আবার কখনও এগুলো বড় ভূমিকম্পের আগাম সতর্কবার্তাও হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ঘনঘন মৃদু কম্পন হলেই যে বড় দুর্যোগ আসন্ন—এমন নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করার সুযোগ নেই বলেও তারা মনে করেন।.
আজকের ভূমিকম্পটি রিখটার স্কেলে প্রায় ৫.৩ থেকে ৫.৪ মাত্রার ছিল বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর ১টা ৫২ থেকে ১টা ৫৪ মিনিটের মধ্যে কম্পনটি অনুভূত হয় এবং কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। মধ্যমাত্রার এই ভূমিকম্প দেশের বিভিন্ন শহরে অনুভূত হয়, বিশেষ করে ঢাকা ও খুলনা অঞ্চলে অনেকেই আতঙ্কে ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন। উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা বা তার আশপাশের এলাকা, যেখানে ভূ-টেকটনিক চাপ সক্রিয় রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।.
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সাম্প্রতিক কম্পনগুলোর বেশিরভাগই সীমান্তবর্তী অঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট ও পার্শ্ববর্তী ফল্ট লাইনের নড়াচড়ার ফল। ঐতিহাসিকভাবেই এসব অঞ্চলে ভূমিকম্পের প্রবণতা বেশি। তবে রাজধানী ঢাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হয় অন্য কারণে—অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল ভবন কাঠামো। বহু ভবন নির্মাণবিধি যথাযথভাবে না মেনে তৈরি হয়েছে; সরু রাস্তা, ঘনবসতি ও অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা সম্ভাব্য উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। ফলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।.
প্রকৌশলীরা সতর্ক করে বলছেন, বড় ভূমিকম্প হলে শুধু ভবন ধস নয়, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। অতীতে পার্শ্ববর্তী দেশে বড় ভূমিকম্পের প্রভাব বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে, যা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে।.
তবে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতি—এমনটাই বলছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবন চিহ্নিত করে সংস্কার, নিয়মিত মহড়া আয়োজন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। স্কুল, হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্প-সহনশীল করে গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।.
সব মিলিয়ে ২৭ দিনে নয়বার ভূমিকম্প নিঃসন্দেহে সতর্কবার্তা বহন করছে। তবে এটিকে অবশ্যম্ভাবী বড় বিপর্যয়ের সরাসরি ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে কাজ করে—মানুষের দায়িত্ব হলো বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত থাকা। ভয় নয়, সচেতনতা ও বাস্তবসম্মত প্রস্তুতিই হতে পারে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি।.
.
সূত্র: এখন টিভি .
Ajker Bogura / সামসিল আরিফিন
আপনার মতামত লিখুন: