রাজধানীসহ সারা দেশে পরিবহণ খাতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ চাঁদা ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও যাত্রীকল্যাণ সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, এই খাত থেকে দৈনিক প্রায় শতকোটি টাকা আদায় করা হয়। বাস, ট্রাক, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, টেম্পো ও লেগুনাসহ প্রায় সব ধরনের যানবাহন থেকেই টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পার্কিং, পৌর টোলসহ নানা নামে অর্থ নেওয়া হয়, যার বড় অংশ চালক ও মালিকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক আদায় করা হয়।
সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ বিষয়ে বলেন, চাঁদা ও চাঁদাবাজির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার মতে, স্বেচ্ছায় দেওয়া অর্থ চাঁদা, আর জোরপূর্বক আদায় চাঁদাবাজি, যা ফৌজদারি অপরাধ। তিনি জানান, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এবং প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার জন্য নেওয়া অর্থকে তিনি এক ধরনের অলিখিত বিধি হিসেবে উল্লেখ করেন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, পার্কিং ফি, পৌর টোলের অতিরিক্ত আদায় এবং রাস্তায় দায়িত্বপালনরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা তোলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মালিক ও শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্যদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গাড়ি ভাঙচুর, মারধর ও ব্যবসা বন্ধের হুমকির ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সিটি বাস, দূরপাল্লার বাস, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন থেকে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। তাদের হিসাব মতে, শুধু বাস খাত থেকে দৈনিক কয়েক কোটি টাকা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ট্রাক থেকে কয়েক দশক কোটি টাকা এবং অন্যান্য যানবাহন মিলিয়ে মোট দৈনিক চাঁদার পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকায় পৌঁছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে পরিবহণ ভাড়া ও পণ্যের দাম বাড়ে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর গিয়ে পড়ে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চাঁদা ও চাঁদাবাজি—দুটোই পরিবহণ খাতে বিদ্যমান এবং বিভিন্ন স্তরের সংগঠন ও কর্তৃপক্ষ এতে যুক্ত। তিনি দাবি করেন, ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ব্যবস্থা ও ক্যামেরাভিত্তিক মামলা ব্যবস্থা চালু করা গেলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব। তবে অতীতে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু দাবি করেন, বর্তমানে শ্রমিক ফেডারেশনের নামে সরাসরি চাঁদা নেওয়া হচ্ছে না, তবে অন্যান্য খাতে চাঁদা বন্ধ হয়নি এবং পুলিশসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবহণ মালিকদের টাকা দিতে হচ্ছে। অপরদিকে পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার জন্য নেওয়া অর্থ চাঁদা নয়, এটি ব্যবস্থাপনা খরচ; তবে টার্মিনালের বাইরে নানা খাতে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না।
হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা বলেন, মহাসড়কে চাঁদাবাজি কমলেও টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু অভিযোগ রয়েছে এবং কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন। স্বচ্ছ তদন্ত, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সিন্ডিকেট ভাঙা কঠিন, আর এই অব্যবস্থার খেসারত প্রতিনিয়ত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ বাড়তি ভাড়া ও দ্রব্যমূল্যের মাধ্যমে।.
Ajker Bogura / সামসিল আরিফিন
আপনার মতামত লিখুন: