বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে এখন পর্যন্ত কয়েক মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকায় তাৎক্ষণিক সরবরাহে তেমন সমস্যা না হলেও, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব দেশের ওষুধ শিল্পের ওপর পড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।.
প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত.
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত বেসিক কেমিক্যাল ও কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে।.
বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে এখন পর্যন্ত কয়েক মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকায় তাৎক্ষণিক সরবরাহে তেমন সমস্যা না হলেও, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব দেশের ওষুধ শিল্পের ওপর পড়বে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।.
রোববার ১৭তম এশিয়া এক্সপোতে অংশ নেওয়া ওষুধ শিল্প মালিক ও কাঁচামাল আমদানিকারকেরা এসব তথ্য জানান।.
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই)-এর সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, "পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর বেসিক কেমিক্যালের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। আগে যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার ছিল, তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কেমিক্যাল ও ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের ওপর। তবে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে কাঁচামালের দাম আবার কমে আসতে পারে।".
তিনি বলেন, "যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু ওষুধ শিল্প নয়, বিশ্বজুড়ে সব শিল্পের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আমাদের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।".
তিনি আরও বলেন, "দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার যানবাহনের মাধ্যমে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। সরকার এপ্রিল পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।".
তবে আপাতত ওষুধের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ওষুধ শিল্প মালিকেরা।.
ওষুধের কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিবিকন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি.এইচ. শামীম বলেন, "বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত প্রায় সব ধরনের কাঁচামালের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে শিল্পে চাপ তৈরি হয়েছে।".
তিনি জানান, "গ্যাস সংকট এবং সলভেন্টসহ বিভিন্ন বেসিক ইন্টারমিডিয়েটের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ওষুধের উৎপাদন খরচে পড়ছে।".
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হওয়ায় কোম্পানিগুলোর বিকল্প কম। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়লেও খুচরা মূল্য (এমআরপি) অপরিবর্তিত থাকায় অনেক কোম্পানিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।.
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান ডি.এইচ. শামীম। তিনি বলেন, "সাধারণত কোম্পানিগুলোর তিন থেকে ছয় মাসের কাঁচামাল মজুদ থাকে। তবে যুদ্ধ যদি এক থেকে দুই মাসের বেশি স্থায়ী হয়, তাহলে বর্তমান মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বড় সংকট তৈরি হতে পারে।".
ভারতের এপিআই ও কনট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিশেষায়িত ওষুধ কোম্পানি লি ফার্মার পরিচালক রঘু মিত্র এ. বলেন, "এখনই কাঁচামাল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্ডার নেওয়া যাচ্ছে না। আগামী দুই থেকে তিন মাস হয়তো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, কিন্তু এর পরে কী হবে তা অনিশ্চিত।".
এপিআইয়ের বিকল্প উৎস খোঁজা সময়সাপেক্ষ.
চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ওষুধের কাঁচামাল বা এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজতে গত ২৪ মার্চ ওষুধ শিল্প সমিতিকে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। .
বিকল্প উৎস খোঁজার সরকারি নির্দেশনা ইতিবাচক হলেও সময়সাপেক্ষ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বিএপিআই)-এর মহাসচিব ডা. মোহাম্মদ জাকির হোসেন।.
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকে ভারত ও চীনের বাইরে নতুন উৎস খোঁজার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা দ্রুত সম্ভব নয়। কাঁচামাল হুট করে যেকোনো দেশ থেকে আনা যায় না। একটি নতুন উৎস থেকে কাঁচামাল আনতে হলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।".
ডা. জাকির হোসেন ব্যাখ্যা করেন, "নতুন কোনো দেশের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল আনতে হলে প্রথমে সেই প্রতিষ্ঠানের ডকুমেন্ট যাচাই, এরপর নমুনা সংগ্রহ, ল্যাব টেস্ট, প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট এবং কমপক্ষে ছয় মাসের স্ট্যাবিলিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সাধারণত ৯ থেকে ১৪ মাস সময় লাগে।".
তিনি আরও বলেন, বিশ্বে অধিকাংশ ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন পেট্রোকেমিক্যালের ওপর নির্ভরশীল, যা মূলত চীন ও ভারতকেন্দ্রিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে আসে। বিকল্প হিসেবে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ কিছু দেশ থেকে সীমিত পরিসরে কাঁচামাল আনা সম্ভব হলেও তা ব্যয়বহুল এবং সব ধরনের পণ্যের জন্য প্রযোজ্য নয়।.
তিনি বলেন, "চীন ও ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকায় আমরা প্রতিযোগিতামূলক দামে কাঁচামাল পাই। নতুন উৎসে গেলে দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে।".
বর্তমানে সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা না থাকলেও কিছু কাঁচামাল ও প্রাইমারি প্যাকেজিং উপকরণের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে বলে জানান ডা. জাকির হোসেন। "আমাদের সাধারণত দুই থেকে তিন মাসের মজুত থাকে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও এক-দুই মাস দীর্ঘ হলে নতুন চালানে বাড়তি দামের প্রভাব বাজারে পড়তে শুরু করবে।".
তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে আমরা যাদের কাছ থেকে কাঁচামাল আমদানি করি, তাদের মধ্যে কিছু কোম্পানি দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং পেট্রোকেমিক্যাল সংকট অব্যাহত থাকলে ওষুধ শিল্পের ওপর চাপ বাড়বে।".
তিন দিনব্যাপী দক্ষিণ এশিয়ার ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন প্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান প্রদর্শনী 'এশিয়া ফার্মা এক্সপো ২০২৬' ও 'এশিয়া ল্যাব এক্সপো ২০২৬' গতকাল বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে শুরু হয়েছে। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বাকুল।.
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সরকার দেশের ওষুধ খাতের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ খাতকে এগিয়ে নিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ খাতের উন্নয়নে সহায়তা অব্যাহত রাখবে।.
চলতি বছরের এই আয়োজনে ২০টির বেশি দেশের ৪০০-এর বেশি প্রদর্শক অংশ নিয়েছে। প্রদর্শনীতে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রসেসিং, প্যাকেজিং, এপিআই ও এক্সিপিয়েন্ট, বিশ্লেষণাত্মক ও ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি, ক্লিনরুম ও এইচভিএসি সিস্টেম, পানি ব্যবস্থাপনা এবং টার্নকি প্রকল্প সেবাসংক্রান্ত প্রযুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।. .
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: