ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন সারা দেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এর অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকা আওয়ামী লীগের কার্যালয় ফের খুলছেন তারা।.
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলেছেন দলটির কর্মীরা। এর আগে শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ফটকের সামনে জাতীয় পতাকা ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রেখে স্লোগান দেন যুব মহিলা লীগের কয়েকজন নেত্রী। এদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সংগঠনের ১০-১২ জন নেতাকর্মীকে ধানমন্ডি ৩/এ সড়কের ৫১ নম্বর বাড়ির সামনে অবস্থান করতে দেখা যায়।.
এছাড়া সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরের বাঘাইছড়িতেও আওয়ামীলীগের কার্যালয় খুলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানো এবং ব্যানার ঝুলানোর ঘটনা ঘটেছে। .
২০২৪ এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তাদের রাজনৈতিক কার্যালয়গুলো ভাঙচুর করে তালা দেওয়া হয়। পরে প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর সব অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার ।.
এরপর থেকে মূলত গা ঢাকা দিয়েই চলছিলেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির ভোটব্যাংক ফের আলোচনায় আসে। বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই আওয়ামী লীগের ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য অনেক ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়। এতে দলটিও ফের প্রাসঙ্গিকতা পায়। .
নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম উত্তরের জেলা পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়ার খবর আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তালা খুলে দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান। .
ওই ভিডিওতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বুলেট বলেন, 'বিএনপি বিপুল আসনে সারা বাংলাদেশে সরকার গঠনের পথে, এই প্রথম মুহূর্তে পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সংগ্রামী সভাপতি আবু দাউদ প্রধান প্রথমেই যে কাজটি করেছেন, আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রাণের যে সংগঠন, আমাদের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে তিনি আজকে তালামুক্ত-অবমুক্ত করেছেন।' এ ঘটনা অনলাইনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।.
১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা শ্লোগান দেন 'আওয়ামী লীগকে কথা দিলাম, পার্টি অফিস দখল নিলাম।' তারা কার্যালয়ের সামনে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশ্ন করেন। .
১৬ ফেব্রুয়ারি বরগুনার বেতাগী উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ঢুকে পড়েন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। বেতাগী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিফাত সিকদার ওইদিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, 'আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন, ধানমন্ডি ৩২-সহ আমাদের স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত শুরু করতে।' .
ওই দিনই সকালে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা কার্যালয়ও খোলা হয়। অফিস খোলার পর সেখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নামে দোয়া ও মোনাজাত করেন। .
একইদিন বিকালে খুলনা মহানগরীর শঙ্খ মার্কেটে আওয়ামী লীগ অফিস খুলে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রবেশ করেন। সেখানে তারা কিছুক্ষণ অবস্থান করে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবিতে মালা দিয়ে 'জয় বাংলা' স্লোগান দেন। এরপর তারা তালা লাগিয়ে চলে যান। .
১৮ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরের পালং বাজারে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুলে 'জয় বাংলা' স্লোগান দেন ১৫-২০ জন নেতা-কর্মী। এ সময় তারা কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙান । তবে তাদের মুখ মাস্ক ও হেলমেট দিয়ে ঢাকা ছিল। একই দিন সকালে ছাত্রলীগের ৩০-৩৫ জন নেতা-কর্মী তালা ভেঙে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ঢোকেন। এরপর 'জয় বাংলা'সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে কার্যালয়টিতে ব্যানার টাঙিয়ে সটকে পড়েন। .
নারায়ণগঞ্জ শহরের ২ নং রেলগেট এলাকায় ২০ ফেব্রুয়ারি জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ব্যানার টাঙিয়ে স্লোগান দেন কয়েকজন। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে লাগানো হয়েছে দলীয় পরিচিতি ফলক। এর আগে দলটির চট্টগ্রাম জেলা উত্তর কার্যালয়ে পরিচিত ফলক লাগানো হয়েছিল। .
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সবুজ সংকেত রয়েছে। .
নাহিদ বলেন, 'বিএনপির কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করার সুযোগ বা সাহস পেত না।' .
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ টিবিএসকে বলেন, যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক তারা তো নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু আপস, সমঝোতা হয়েছে। সেটার ফলাফল হিসাবেই এখন কার্যালয় খোলার ঘটনাগুলো ঘটছে। .
তবে তিনি মনে করেন, এসব ঘটনার কোন প্রভাব সহসা জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে না।.
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: