সারাদেশে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তৎপরতা। বিভিন্ন এলাকায় চাঁদার দাবিতে গুলি চালানো, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো, এমনকি ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মতো সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সম্প্রতি চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম নগরের এক ব্যবসায়ীর বাসায় পুলিশ পাহারার মধ্যেই মুহুর্মুহু গুলি চালানোর ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শুধু চট্টগ্রামই নয়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।.
.
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজি এবং বোরকা পরে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার বাদল–এর নাম সামনে এসেছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। হামলার শিকার ব্যক্তি বলেন, হামলাকারীরা বোরকা পরে ছিল এবং হামলার সময় তিনি গুরুতর আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে। বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে চাঁদা দাবি করা, টাকা না দিলে হামলা, কোপানো এবং নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে। এমনকি টার্গেট কিলিংয়ের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে।.
.
গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আদাবর এলাকায় চাঁদা না পেয়ে একটি এমব্রয়ডারি কারখানার তিন কর্মচারীকে কুপিয়ে জখম করে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল। একইভাবে বসিলা এলাকার সিটি হাউজিংয়ে এক দোকান কর্মচারীকে চাঁদা না দেওয়ায় ইলেকট্রিক শক দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তবে ভুক্তভোগীদের দাবি—হুমকি-ধমকি এখনও বন্ধ হয়নি।
এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা এখনও ভয়ে আছি। তারা বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাস্তাঘাটে চলাচল করতেও নিরাপদ মনে হয় না।”
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় তিন হাজার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ৪০১ জন এবং তাদের মধ্যে ১৫ জনকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক সন্ত্রাসী রয়েছে চট্টগ্রামে—প্রায় ৩৩০ জন।.
.
এমন পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করে কঠোর অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, অভিযুক্তদের শনাক্ত করে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
এরই মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) রাজধানীর মার্কেট, কাঁচাবাজার, ঘাট, ফুটপাত ও ভাসমান দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, কারা চাঁদা তুলছে, কারা নেপথ্যে আছে এবং কারা তাদের পৃষ্ঠপোষক—সবকিছুই তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এ কাজে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও যুক্ত রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অনেক সময় রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ের কারণে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করা গেলে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অনেকটাই কমে আসবে।.
.
এদিকে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, শুধু সন্ত্রাসীদের নয়, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বা তাদের সহায়তাকারী যেই হোক না কেন—সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারবে।.
Ajker Bogura / সামসিল আরিফিন
আপনার মতামত লিখুন: