চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে ফল আমদানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। তা সত্ত্বেও, এবারের রমজানে ফলের দাম চড়া থাকায় অনেক জনপ্রিয় ফল নিম্ন ও মধ্যম-আয়ের ভোক্তাদের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে।.
চট্টগ্রামের ফলের বাজারগুলোতে রমজানের আগের তুলনায় পাইকারি পর্যায়ে ফলের দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। ফলে বাড়তি আমদানির সুফল সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।.
ব্যবসায়ীদের দাবি, রমজানে অতিরিক্ত চাহিদা ও মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক-করের বোঝাই ফলের দাম বেশি হওয়ার মূল কারণ। অন্যদিকে ভোক্তারা বাজার কারসাজি ও তদারকির অভাবকেই এর জন্য দায়ী করছেন।.
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ফল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৩২৭ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৮ হাজার ২০ টনে। আমদানিকৃত ফলের মধ্যে রয়েছে আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি, মাল্টা, আনারস, জাম্বুরা, পেয়ারা ও খেজুর।.
কিন্তু চট্টগ্রামে ফলের বৃহৎ পাইকারি বাজার ফলমন্ডিতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন আমদানিকৃত ফলের দামে ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে দাম বেশ চড়া। .
নগরীর হামজার বাগ এলাকায় ফল কিনতে আসা ক্রেতা আব্দুল হামিদ বলেন, রোজায় বাচ্চারা ফল খেতে চায়। কিন্তু এক কেজি ভালো আঙুর কিনতেই এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মতো খরচ হয়। সব ধরনের ফল একসঙ্গে কেনা সম্ভব না হওয়ায় তিনি আগের তুলনায় কম পরিমাণে ফল কিনছেন।'.
রিয়াজউদ্দিন বাজারের খুচরা বিক্রেতা রাকিব উদ্দিন দামের পার্থক্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, পাইকারি বাজারেই ফলের দাম বেশি। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, দোকান ভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি যোগ হয়। পাশাপাশি ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই সীমিত লাভে বিক্রি করতে হয়।.
বেড়েছে আমদানি.
বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানি করা হয়, যার সিংহভাগই আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। সেখান থেকেই সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্থলবন্দর দিয়েও কিছু ফল আমদানি হয়।.
বাংলাদেশ মূলত ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ভুটান, মিশর, ব্রাজিল, তিউনিসিয়া, পর্তুগাল, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ফ্রান্স থেকে ফল আমদানি করে। আর বিভিন্ন জাতের খেজুর আসে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে।.
উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বন্দর দিয়ে আপেল, কমলা ও আঙুর আমদানি হয়েছে মোট ২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৫ টন।.
আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই তিনটি ফলের আমদানি ছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৭ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ফলগুলোর আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭০ হাজার টন।.
ফলের চড়া দাম.
ফলমন্ডিতে মাল্টার ১৫ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায়। চায়না আপেল ২০ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। ভালো মানের আপেলের ২০ কেজির কার্টনের দাম ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৭০০ টাকা। .
এছাড়া সাদা আঙুর ১০ কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকায় এবং মানভেদে কালো আঙুর ১০ কেজির কার্টনের দাম ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৩০০ টাকা। কমলার সাড়ে আট কেজির কার্টন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। .
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর খুচরা বাজারেও ফলের দামে রমজানের আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি আনার বিক্রি হতো প্রায় ৪৫০ টাকায়, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ টাকায়। .
চায়না কমলা আগে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাল্টা আগে ৩০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩৫০ টাকায়। আগে প্রতি কেজি আপেল বিক্রি হতো প্রায় ৩০০ টাকায়, এখন তা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। .
প্রতি কেজি নাশপাতি আগে ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালো আঙুর আগে ৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এখন ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। .
'চাহিদা বেশি থাকলে দাম বাড়ে'.
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম বলেন, লাভ হচ্ছে শুনেই অনেক ব্যবসায়ী ফল আমদানি করতে 'হুমড়ি খেয়ে পড়েন'। কিন্তু পরে লোকসান করে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান। .
তিনি আরও বলেন, কাঁচা মালের বাজারে কখনো সিন্ডিকেট করা সম্ভব নয়। 'আমদানির তুলনায় চাহিদা বেশি থাকলে দাম বাড়ে। আর আমদানির তুলনায় চাহিদা কম থাকলে দাম কমে,' বলেন তিনি।.
অন্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফলের দামের ওপর আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার এবং শুল্ক-কর কাঠামোর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। এছাড়া ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে আমদানি খরচও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারের দামের ওপর।.
ফল আমদানিতে শুল্ক.
২০২১-২২ অর্থবছরে ফল আমদানিতে মোট শুল্ক ছিল ৮৯.৩২ শতাংশ। তবে গত তিন বছরে ফল আমদানিতে মোট করের বোঝা বেড়ে প্রায় ১১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। .
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৫৬ সালের এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী, তাজা ফল অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে বিবেচিত, বিলাসপণ্য নয়। .
কমিশন সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে নামানো, অগ্রিম কর ১০ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ করা এবং ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও ৫ শতাংশ আগাম কর বাতিলের সুপারিশ করেছিল। পরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করে এবং আমদানি পর্যায়ের ৫ শতাংশ আগাম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করে।.
তৌহিদুল আলম বলেন, কিছু শুল্ক কমালেও ফলভেদে এখনো ১০০ টাকার ফলে ১২০ থেকে ১৩৬ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। .
তিনি আরও বলেন, ফলের শুল্ক আরও কমিয়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। 'তাহলে অধিকাংশ ফলের দাম ২০০ টাকার নিচে চলে আসবে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ ফল খেতে পারবে।' .
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন টিবিএসকে বলেন, ফলের বাজারে নৈরাজ্য থামছে না। 'যতই আমদানি হোক, যতই শুল্ক কমাক, এর প্রভাব বাজারে পড়বে না। কেননা এই বাজার পুরোপুরি তদারকির বাইরে।' .
তিনি আরও বলেন, আমদানিকারকরা কম শুল্ক দিয়ে পণ্য আমদানি করে বেশি শুল্কের পণ্য বলে বিক্রি করে মানুষকে বোকা বানাচ্ছেন। বিশেষ করে রমজান এলে তাদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যায়। .
'কী কারণে ফলের এত দাম, তারা কোন ধরনের ফলে কী পরিমাণ ডিউটি দিচ্ছেন, তা এনবিআরকে স্পষ্ট করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি করতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের পক্ষে এত দামে ফল কিনে খাওয়া প্রায় অসম্ভব,' বলেন তিনি।. .
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: