• ঢাকা
  • শনিবার, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ০৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

অতিরিক্ত সরবরাহে ‘উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে’ বিক্রি, ব্যাপক লোকসানে পেঁয়াজ চাষিরা


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০২:১৫ পিএম
অতিরিক্ত সরবরাহে ‘উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও কম দামে’ বিক্রি, ব্যাপক লোকসানে পেঁয়াজ চাষিরা

বাজারে পেঁয়াজের সরবারহ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় দাম হুহু করে কমছে। এতে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে পণ্যটি। ফলে ফরিদপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পেঁয়াজ চাষিরা চলতি মৌসুমে ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন। .

কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে অনেক বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ প্রতি মণে উৎপাদন খরচ পড়ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এর ফলে চাষিদের বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে।.

কৃষি কর্মকর্তারা দাম কমার পেছনে বেশ কিছু জেলায় ব্যাপক চাষাবাদ ও বাম্পার ফলনের ফলে বাজারে অক্তিরিক্ত সরবরাহকে দায়ী করছেন।.

উত্তরাঞ্চলে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও জয়পুরহাট মিলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অঞ্চল। এ অঞ্চলে প্রায় ৫৯ হাজার ৪৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শুধু পাবনাতেই চাষ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে।.

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় এবার ১৬ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে মুড়িকাটা পেঁয়াজ।.

চাষিরা বলছেন, চলতি মৌসুমে মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসে দেড় থেকে দুই মাস আগে। প্রথম দিকে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। পরে দাম কমে এক পর্যায়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে।.

পাবনার কাশিনাথপুরের চাষি বাবলু জানান, গড়ে প্রতি মণ পেঁয়াজে উৎপাদন খরচ হয়েছে ১ হাজার ৬০০ টাকা। .

'এক সপ্তাহ আগেও পেঁয়াজ বিক্রি করে অল্প হলেও লাভ হয়েছিল। কিন্তু এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে। মাঠে এখনো প্রচুর পেঁয়াজ রয়েছে,' বলেন তিনি।.

চাষিরা বলছেন, তারা সাধারণত ঋণ করে পেঁয়াজের আবাদ করেন। এখন পেঁয়াজ বিক্রি করে খরচই উঠছে না। ঋণ শোধ তো দূরের কথা, এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে তাদের।.

প্রতি বছর অন্তত ১০ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেন নওগাঁ সদরের কৃষক গোলাম মোস্তফা। .

তিনি বলেন, 'কৃষক জমি তো আর ফেলে রাখবেন না। আমাদের আয়ের অন্য কোনো উৎসও নেই। বাধ্য হয়েই পেঁয়াজ চাষ করতে হয়। আমাদের জমিতে আলু আর পেঁয়াজ ছাড়া অন্য ফসল ভালো হয় না। এবার আলু চাষ করেও লোকসানে।' .

নওগাঁর মান্দা উপজেলার সতিহাটের পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় পাইকারি দোকানদার মোতাহার হোসেন বলেন, মাঠে থাকা পেঁয়াজের বেশিরভাগই পরিপক্ব হয়েছে। কিন্তু এখন দাম কম হওয়ায় অনেক কৃষক পেঁয়াজ মাঠ থেকে তুলতে চাচ্ছেন না। .

'হাটে পেঁয়াজের ব্যাপক সরবরাহ, সে তুলনায় চাহিদা নেই। ঈদের আগে হয়তো পেঁয়াজের দাম বাড়তে পারে। না বাড়লে আলুর মতো গলার কাঁটা হয়ে থাকবে পেঁয়াজ,' বলেন তিনি।.

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মুড়িকাটা ও হালি—এই দুই পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ হয় দেশে। .

মুড়িকাটা পদ্ধতিতে অক্টোবর-নভেম্বরে আবাদ করা হয়। ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চের মধ্যে ফসল ঘরে তোলা হয়। অন্যদিকে হালি পদ্ধতিতে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আবাদ করে মার্চ-এপ্রিলে পেঁয়াজ তোলা হয়। .

গত দুই বছর ধরে চাষিরা পেঁয়াজ চাষ করে লোকসানে রয়েছেন বলে জানান কর্মকর্তারা।  .

কৃষি সম্প্রসারণ বগুড়া অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, গত দু-বছর ধরে আলু আর পেঁয়াজ চাষ করে চাষিরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ছেন। .

'বর্তমান বাজারে যে পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, তার বাজারদার ৫০ টাকার নিচে হলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এখন হচ্ছেও তাই। বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের কোনো হাত নেই,' বলেন তিনি।.

ফরিদপুরেও একই রকম লোকসানে পেঁয়াজ চাষিরা.

পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর জেলা ফরিদপুরেও একই পরিস্থিতি বিরাজমান। কৃষকরা বলছেন, বাম্পার ফলন হলেও পেজঁয়াজের দাম কমে গেছে ব্যাপকভাবে।.

বর্তমানে ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলার মাঠে মাঠে চলছে পেঁয়াজ ওঠানোর ধুম। তবে খরচের তুলনায় পেঁয়াজের দাম কম থাকায় চাষিদের চোখে-মুখে মলিন হাসি। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের তফাত থাকায় হতাশ তারা। .

কৃষকরা বলছেন, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি ও সেচ খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। .

কিন্তু বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৯৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রতি মণে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।.

সালতথা উপজেলার বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক শফিকুল বলেন, 'প্রতি মণে ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে এখন এত কম দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।' .

অনেক কৃষক দেনা পরিশোধের চাপে বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন বলে জানান। .

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। তবে আবাদ হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে।.

শুধু সালথা উপজেলাতেই প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। .

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, 'বাজারে পেঁয়াজের জোগান বেড়েছে অনেক, সেই তুলনায় ক্রেতাদের চাহিদা কম থাকায় দর পড়ে গেছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও চাষাবাদ হয়েছে বেশি। আমার পরামর্শ। এই মুহূর্তে পেঁয়াজ বিক্রি না করে কয়েক মাস সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করলে কৃষকরা ভালো দর পাবেন।'.

তবে কৃষকরা বলছেন, অনেক ইউনিয়নে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় ক্ষুদ্র চাষিদের পক্ষে দীর্ঘদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না।.

জসিমউদ্দিন ৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ন্যায্য দাম না পেলে ভবিষ্যতে কৃষকরা পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাবেন। 'এতে দেশি উৎপাদন কমলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে।'.

সালথার নকুলহাটি, ঠেনঠেনিয়া, কাগদি, মাঝারদিয়াসহ বিভিন্ন হাটে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এলেও পেঁয়াজের দাম বাড়ছে না। .

মালেক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল খালেক বলেন, 'প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৫-২৬ টাকায় কিনছি, অনেক সময় কেজিতে ১-২ টাকা লোকসান হচ্ছে। মণপ্রতি দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়ই লাভবান হতো।'.

নগরকান্দা, ভাঙ্গা, বোয়ালমারী ও মধুখালী উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায় একই চিত্র।.

হাসামদিয়া গ্রামের কওসার মজুমদার বলেন, তিনি ৩০ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ চাষে ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ করেছেন। 'ঘাটতি পূরণ করতে হলে ২ হাাজার টাকা থেকে ২ হাাজার ৫০০ টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা দরকার। সরকারের কাছে আমরা পেঁয়াজের দাম বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি,' বলেন তিনি। . .

Ajker Bogura / Md Shourov Hossain

জাতীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ