• ঢাকা
  • শনিবার, ১৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ২৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

পেঁয়াজের কেজি মাত্র ৫ টাকা, চাষিরা চরম ক্ষতির মুখে


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ০৩:৫৩ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

রাজশাহীতে পেঁয়াজের কেজি দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়ে চাষিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চলমান জ্বালানি সংকটের ধাক্কা পরিবহণ সেক্টরে পড়ায় বেপারিরা রাজধানীসহ দেশের বড় মোকামগুলোতে পেঁয়াজ পাঠাতে পারছেন না। এর ফলে রাজশাহীসহ উত্তরের বিভিন্ন মোকামে পেঁয়াজের দরপতন ঘটেছে। শুক্রবার রাজশাহীর কয়েকটি হাটবাজার ও মোকামে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মন দরে। এই অনুযায়ী চাষিরা প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পেয়েছেন মাত্র পৌনে ৪ থেকে ৫ টাকা করে। চাষিরা জানান, দুই সপ্তাহ আগেও তারা প্রতি মন পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা মন দরে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা বিক্রি হলেও উত্তরের হাটবাজার ও মোকামে চাষিরা বাধ্য হচ্ছেন মাত্র পৌনে ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে। রাজশাহীর বাগমারার চাষি আফসার আলী জানান, গত ১৫ বছরেও এত অস্বাভাবিক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রির কোনো রেকর্ড নেই। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে তার এলাকার হাজার হাজার পেঁয়াজ চাষি পুঁজি হারিয়ে পথে বসছেন। কয়েকজন চাষি জানান, বাড়ি থেকে হাটে ও মোকামে পেঁয়াজ পৌঁছে দেওয়ার পরিবহণ খরচ প্রতি মনে ৩০ টাকা। হাটে খাজনা দিতে হয় মনপ্রতি ৩০ টাকা। ফলে এক মন পেঁয়াজ বিক্রি করে চাষির পকেটে উঠছে মাত্র ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। অথচ এক প্রতি মন মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলাতে চাষির খরচ হয়েছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। প্রতি বিঘায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষের খরচ ৪৫ হাজার টাকা। চাষিরা এ বছর এক বিঘায় পেঁয়াজের ফলন পাচ্ছেন ৫৫ থেকে ৬০ মন। কিন্তু মোকামে বিক্রি করছেন মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা কেজি দরে। চাষিদের জন্য এটি এক অসহনীয় অবস্থা। জানা গেছে, রাজশাহীসহ উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের পেঁয়াজপ্রধান সাতটি জেলার হাটবাজার ও মোকামে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই কৃষিপণ্যের অস্বাভাবিক দরপতন ঘটেছে। বর্তমানে চাষিরা জমি থেকে পুরোদমে পেঁয়াজ তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কায় চাষিরা অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ ও শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে দ্রুত পেঁয়াজ উঠাচ্ছেন জমি থেকে। নগদ টাকার প্রয়োজনের কারণে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা জমি থেকেই পেঁয়াজ কেটে-ছেঁটে নিকটবর্তী হাটবাজারে ও মোকামে তুলছেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে তারা অস্বাভাবিক কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারা, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে মানভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মন দরে পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়েছে। অনেক চাষি কম দামে বিক্রি না করে বাড়ির আঙিনায় পালা দিয়ে রাখছেন।.

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা বা আগামজাত পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন। অন্যদিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি মৌসুমে রাজশাহীর সর্বত্রই তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ওঠানো চলছে পুরোদমে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মুড়িকাটা পেঁয়াজ উত্তোলন শেষ হবে। এরপরই উঠতে শুরু করবে ছাঁচি বা দেশিজাতের পেঁয়াজ। জ্বালানি সংকটসহ অন্যান্য কারণে রাজশাহীর তাহেরপুর, আলোকনগর, হাটগাঙ্গোপাড়া, দামনাশ, দুর্গাপুরের আলীপুর, পুঠিয়ার ঝলমলিয়া, মোহনপুরের কেশরহাট, পবার খড়খড়ি ও নওহাটাসহ বিভিন্ন মোকামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে অস্বাভাবিক কম দামে। দাম না পাওয়ায় চাষিরা হাটের ফাঁকা মাঠে পেঁয়াজ রেখে চলে যাচ্ছেন, কারণ পেঁয়াজ কিনতে ক্রেতা পাচ্ছেন না। রাজশাহীর বাগমারার সোনাডাঙ্গা গ্রামের পেঁয়াজ চাষি সুজন কুমার জানান, তিনি এবার ৬ বিঘা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। প্রতি বিঘায় ফলন পেয়েছেন গড়ে ৫৫ মন করে। প্রতি বিঘাতে খরচ হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা, মোট খরচ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। পেঁয়াজ তুলে বাড়িতে পালা করে রেখেছেন। শুক্রবার হাটগাঙ্গোপাড়া মোকামে ৫৫ মন পেঁয়াজ তুলেছিলেন বিক্রির জন্য। এই পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন মাত্র ৭ হাজার ৭০০ টাকায়। এর মধ্যে পরিবহণ ও হাটের খাজনা বাবদ ৩ হাজার ৩০০ টাকা পরিশোধ করেছেন। সব খরচ মিটিয়ে তার পকেটে উঠেছে মাত্র ৪ হাজার ৪০০ টাকা। তিনি বলেন, “মোকামে চালানি ব্যবসায়ীরা আসছে না। পেঁয়াজ তুলে বেশি সময় ঘরেও রাখা যাচ্ছে না। এখন যে দাম পাচ্ছি, তাতেই বিক্রি করছি।” তার মতো শত শত চাষি মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করে বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছেন। পেঁয়াজ বেচা-বিক্রির দেশের অন্যতম বড় মোকাম রাজশাহীর তাহেরপুরের চালানি ব্যবসায়ী মোকসেদ আলী প্রামাণিক জানান, “শত শত মন পেঁয়াজ উঠছে হাটে। কিন্তু বাইরের ব্যবসায়ীরা আসছে না পেঁয়াজ কিনতে। জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাক ভাড়া মিলছে না। শুক্রবার মানভেদে প্রতি মন ১৫৫ থেকে ১৮০ টাকা দরে ২৩০ মন পেঁয়াজ কিনেছি। এই পেঁয়াজ আগামী দুদিনের মধ্যে ঢাকায় চালান করতে হবে। কিন্তু পরিবহণ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া আরও ৩০০ মন পেঁয়াজ কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না বলে কিনিনি।” মোকসেদ আলীর মতো আরও অনেক চালানি ব্যবসায়ী পেঁয়াজ কিনছেন না গাড়ি না পাওয়ার কারণে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলায় দেশের অর্ধেক পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। এই সাতটি জেলায় ১ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে এ জেলাগুলিতে ১৯ লাখ ৮৮ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে পাবনায় সর্বাধিক ৪৫ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ফরিদপুর ও রাজশাহী। সূত্র জানায়, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ৩৬ থেকে ৩৭ লাখ টন। বিপরীতে দেশের বিভিন্ন জেলায় পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৩২ লাখ টন। বাকি চাহিদা পূরণের জন্য ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। পেঁয়াজ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ভরা মৌসুমে মূল্য বিপর্যয়ে প্রতিবছরই হাজার হাজার চাষি আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য। ভরা মৌসুমে সহজলভ্য হওয়ায় মোকামে সরবরাহ বাড়ে, ফলে দাম পড়ে যায়। চাষিরা উৎপাদনসহ আনুসঙ্গিক খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে জমি থেকে তুলেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে হাটে নিয়ে আসেন। এই সুযোগ কাজে লাগায় ফড়িয়া, দালাল ও মজুতদাররা। কম দামে চাষির কাছ থেকে কিনে পেঁয়াজ গুদামে রাখেন। সরবরাহ কমে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে তারা মুনাফা করেন। পেঁয়াজ সংরক্ষণের সুবিধা কম থাকায় চাষিরা পানির দরে বিক্রি করছেন। জ্বালানি সংকটের প্রভাবও পেঁয়াজের দামের ওপর পড়েছে। জানা গেছে, দেশে পেঁয়াজ সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় এটি বেশ কম। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পেঁয়াজপ্রধান সাতটি জেলায় ২৮৫টি মডেল সংরক্ষণাগার আছে। এগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ১০ হাজার টন। স্টোরেজের প্রতিটিতে ২৫০ থেকে ৩০০ মন করে পেঁয়াজ রাখা যায়। কিন্তু বর্তমানে চাষিরা সরকারি সংরক্ষণাগারে পেঁয়াজ রাখার সুযোগ পাচ্ছেন না। রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার জানান, রাজশাহী থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেঁয়াজ, আলু, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিপুল পরিমাণে চালান হয়ে থাকে। বর্তমানে জ্বালানির কিছুটা সমস্যা থাকায় কৃষিপণ্যের চালান ব্যাহত হচ্ছে। চালানে নিয়োজিত পরিবহণগুলো যাতে জ্বালানি পায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।.

 . .

Ajker Bogura / ডি আর/ এসএ

কৃষি বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ