• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ১৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

বাম্পার ফলনেও নেই লাভ, ঋণের বোঝায় জর্জরিত আলু-পেঁয়াজ চাষিরা


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১২:০৩ পিএম
বাম্পার ফলনেও নেই লাভ, ঋণের বোঝায় জর্জরিত আলু-পেঁয়াজ চাষিরা
বাম্পার ফলনেও নেই লাভ, ঋণের বোঝায় জর্জরিত আলু-পেঁয়াজ চাষিরা

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ১৫–১৭ টাকা, অথচ বিক্রি হয়েছে ৪–৭ টাকায়। একইভাবে পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ ৩৮–৪০ টাকা হলেও মাঠপর্যায়ে তা বিক্রি হয়েছে ২০–২৫ টাকায়।.

এ মৌসুমে আলু ও পেঁয়াজের ভালো ফলন হলেও তাতে লাভবান হতে পারেননি দেশের কৃষকরা। উৎপাদন বেশি হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ফলে ঋণ ও লোকসানের এক দুষ্টচক্রে আটকে পড়ছেন কৃষকরা।.

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ১৫–১৭ টাকা, অথচ বিক্রি হয়েছে ৪–৭ টাকায়। একইভাবে পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ ৩৮–৪০ টাকা হলেও মাঠপর্যায়ে তা বিক্রি হয়েছে ২০–২৫ টাকায়।.

গত বছরের মতো এ বছরও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ এবং ভালো ফলনের কারণে বাজারে দরপতন হয়েছে। তবে শুক্রবারের বৃষ্টিতে নতুন করে ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।.

কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখন কৃষির বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একদিকে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা, অন্যদিকে ভালো ফলন হলেও পাচ্ছেন না ন্যায্যমূল্য। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা ঋণের বেড়াজালে আটকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।.

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ৪.৬৭ লাখ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৪.৬৯ লাখ হেক্টরে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমির আলু তোলা হয়েছে। একইভাবে ২.৮৬ লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩.০২ লাখ হেক্টরে।.

দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন এবং পেঁয়াজের ২৬–২৭ লাখ টন। তবে চলতি বছরে আবাদ ও ফলনের ভিত্তিতে কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রায় ১.১৫ কোটি টন আলু এবং ৪৩ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হতে পারে। আগের অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১.১৬ কোটি টন আলু এবং ৪৪ লাখ টন পেঁয়াজ। ফলে চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদনের কারণে সারা বছরই কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের।.

বগুড়া সদরের শাখারিয়া ইউনিয়নের কৃষক দেলোয়ার হোসেন প্রায় ৩৫ বছর ধরে আলু চাষের সঙ্গে যুক্ত। গত বছর তিনি ৫৫০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। এতে তার খরচ হয়েছিল ৬ লাখ টাকার বেশি, সঙ্গে হিমাগার খরচ দিতে হয়েছে আরও ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বছর শেষে তিনি ২ লাখ টাকারও আলু বিক্রি করতে পারেননি। এতে পুঁজি হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি।.

তবুও চলতি বছর দোকান থেকে সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণ বাকিতে নিয়ে ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন দেলোয়ার হোসেন। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, অথচ উৎপাদিত আলু বিক্রি হচ্ছে ১২–১৫ হাজার টাকায়। তার অভিজ্ঞতায় আলুর দামে এমন পতন আগে দেখেননি।.

দেলোয়ার হোসেন বলেন, "এবার আলু নেওয়ার মতো ক্রেতা নেই। অনেক আলু জমি থেকেই তোলা হয়নি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। অনেকেই গরুর খাবার হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন। এসব আলু জমি থেকে ১০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।".

গত বছর দুই বিঘা জমিতে কচুর মুখী চাষ করে ৭০ হাজার টাকা লোকসানে থাকা এই কৃষক জানান, বিভিন্ন ফসলে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে তিনি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। সারের দোকান, কীটনাশকের দোকান—সব জায়গায় দেনা রয়েছে। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে সম্প্রতি ২০ শতক জমি ২ লাখ টাকায় ইজারা দিতে হয়েছে। সেই টাকা দিয়ে ঋণ শোধ ও সংসার চালাতে হয়েছে।.

"এই হলো আমাদের বাস্তবতা," বলেন তিনি।.

বগুড়া সদরের আরেক কৃষক মোসলেম উদ্দিন প্রামাণিক প্রায় ৪৫ বছর ধরে আলু চাষ করছেন। তাদের জমিতে শীতকালে আলু ছাড়া অন্য সবজির ফলন ভালো হয় না বলেই আলু চাষের ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি জানান, গত বছরের লোকসানের পর এ বছর আলুর দাম বাড়বে—এমন আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে উল্টো।.

তিনি বলেন, "বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ সব খরচ উঠেনি আলু বিক্রি করে। চাষাবাদ করতে গিয়ে ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে ৬ শতক জমি ৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। সেই টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করেছি। এখন আলু বিক্রি করে পেটের ভাত জোটে না, বরং ভাত কেড়ে নিচ্ছে।".

বগুড়া সদরের শাখারিয়া এলাকার কৃষক রাজু আহম্মেদ সাড়ে ৮ বিঘা জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ করে অন্তত ৮০ হাজার টাকা ঋণে পড়েছেন। পৈত্রিক জমিতে চাষ করেও লোকসান থেকে বের হতে পারেননি। একই সঙ্গে ৪০ টাকা উৎপাদন খরচের পেঁয়াজ ২০–২৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে তাকে।.

তিনি বলেন, "এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা ঋণের চাপে একসময় আত্মহত্যার দিকেও যেতে পারে। আমিও এখন ঋণে ডুবে আছি। বাধ্য হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাচ্ছি। এই আয়েই সংসার চলছে। কীভাবে ঋণমুক্ত হবো, সেটাই এখন বড় চিন্তা।".

বগুড়া সদরের বাসিন্দা আইনুল হক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি প্রতি বছর ৫ থেকে ৭ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেন।.

তিনি বলেন, "কোন ফসলে কত লাভ-লোকসান হলো, কৃষকরা সবসময় তা হিসাব করেন না। আমাদের জমি তিন ফসলি হওয়ায় একটির লাভ অন্যটির লোকসান পুষিয়ে দেয়। কিন্তু এবার আলুর লোকসান এত বেশি যে অন্য ফসলের লাভ দিয়েও তা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। এতে কৃষক নিঃস্ব হওয়ার পথে।".

তিনি আরও বলেন, "এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে কীটনাশক ও সারের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। পাশাপাশি আলু রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হবে।".

নওগাঁ সদরের ভীমপুর গ্রামের কৃষক মোকাব্বর আলী গত বছর ২০ হাজার টাকা লোকসানের পরও এ বছর তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। কিন্তু এবারও লোকসানে পড়েছেন। তিনি জানান, প্রতি মণ আলু ২০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে।.

তিনি বলেন, "কৃষক তো জমি ফেলে রাখতে পারে না। আমাদের আয়ের অন্য কোনো উৎসও নেই। বাধ্য হয়েই আলু বা পেঁয়াজ চাষ করতে হয়। কিন্তু এবার দুই ফসলেই ভয়াবহ লোকসান। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।".

আলু ও পেঁয়াজের বাজারে ধসের বিষয়টি উল্লেখ করে সমাধানের জন্য সরকারের উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মাহফুজ আলম। .

তিনি বলেন, দেশে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি আলু উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু রপ্তানি সেভাবে হচ্ছে না। এছাড়া আলু থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হচ্ছে না।.

তিনি বলেন, "এই কারণে সংকট দিন দিন বাড়ছে। এসব বিষয়ে সরকারের করণীয় রয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সমস্যার সমাধান সহজ হবে।". .

Ajker Bogura / Md Shourov Hossain

অর্থনীতি বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ