বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বর্তমান সংকটকে ঘিরে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে দিন দিন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে, কোনো প্রকৃত সংকট নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানী থেকে জেলা শহর—বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোলপাম্পের সামনে কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, আর তবুও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে স্বীকার করেছে, প্রকৃত ঘাটতির চেয়ে অবৈধ মজুদ ও সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। .
.
কয়েকদিন আগেও দেশের অনেক পাম্পে এক ফোঁটা তেলও পাওয়া যাচ্ছিল না, অথচ প্রশাসনের অভিযানে বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় মানুষের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, তেলের দাম বাড়ার আগাম খবর পেয়েই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী চক্র সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তেল মজুদ করে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।.
.
জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে দেশে যথেষ্ট তেল রয়েছে, সংকটের কোনো কারণ নেই। কিন্তু বাস্তবে বহু পাম্পে সীমিত বিক্রি, কোথাও সম্পূর্ণ বিক্রি বন্ধ, কোথাও আবার নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। এই দ্বৈত অবস্থানে সাধারণ মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছে—যদি তেল থাকে, তবে মানুষ রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকবে কেন? .
.
বগুড়ার মিতালী পাম্পে হৃদয়বিদারক দৃশ্য.
.
বগুড়ার মিতালী পাম্পে সম্প্রতি এমন এক দৃশ্য দেখা গেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে।.
একজন মোটরসাইকেল আরোহী ছোট্ট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন। শুক্রবারের ছুটিতে পরিবারের কাছে যাওয়ার তাড়া ছিল তার। তিনি পাম্পকর্মীদের কাছে বহুবার অনুরোধ করেন, হাতজোড় করে বলেন—“শুধু সামান্য একটু তেল দেন, মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।”.
.
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, পাম্পের কর্মীরা তার কথায় কর্ণপাত করেননি। বরং তাকে অপমান করে সরে যেতে বলা হয়।.
.
অথচ ঠিক সেই পাম্পের পাশেই ছোট একটি দোকানে খোলা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রি করতে দেখা যায় আরেকজনকে। ঘটনাটি দেখে উপস্থিত অনেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন। প্রশ্ন ওঠে—.
পাম্পে তেল নেই, কিন্তু পাশের দোকানে অতিরিক্ত দামে তেল এলো কোথা থেকে?.
.
এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি হতাশ কণ্ঠে বলেন—.
“আগে ভেজাল তেল দেয় বলে এখানে আসতাম না। তবুও ভাই ভাই করে ডাকত। এখন এমন অবস্থা, মানুষের পা পড়েও না মাটিতে।”.
.
এই দৃশ্য শুধু একজন মানুষের নয়—এ যেন আজকের বাংলাদেশের হাজারো ভুক্তভোগীর প্রতিচ্ছবি।.
.
পাম্পের সামনে অপমান, ক্ষোভে ফুঁসছেন বাইকাররা.
.
বিভিন্ন জেলায় বাইকার, রাইডার ও সাধারণ চালকদের অভিযোগ—.
পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না তেল।.
অনেকে মোটরসাইকেল ঠেলে এনে লাইনে রেখে কাকুতি-মিনতি করেছেন।.
কেউ কর্মস্থলে যেতে পারেননি।.
কেউ অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে আটকে পড়েছেন।.
কেউ আবার সন্তানকে নিয়ে মাঝপথে অসহায় হয়ে পড়েছেন।.
.
কিন্তু অভিযোগ, অনেক পাম্পকর্মীর আচরণ ছিল অমানবিক ও রূঢ়।.
কথায় কথায় ধমক, অপমান, এমনকি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা।.
.
সরকারের নীরবতায় বাড়ছে প্রশ্ন.
.
দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি সংকটে মানুষ যখন চরম ভোগান্তিতে, তখন সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।.
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একদিকে বলছেন “পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে”, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তেলের জন্য হাহাকার থামছে না।.
.
বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় একাধিক পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও প্রকাশ হয়েছে। .
.
মানুষের প্রশ্ন একটাই—.
এই কষ্ট কি শুধুই সাধারণ মানুষের জন্য?.
আর সিন্ডিকেট, কালোবাজারি ও অসাধু ব্যবসায়ীরা কি থেকে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে?.
.
শেষ কথা.
.
আজ যারা এক ফোঁটা তেলের জন্য মানুষের কষ্ট দেখেও নির্লিপ্ত,.
যারা অসহায় বাবার অনুরোধ শুনেও ফিরিয়ে দিচ্ছে,.
যারা সংকটকে ব্যবসায় পরিণত করেছে—.
.
সময়ের ব্যবধানে হয়তো সংকট কেটে যাবে।.
কিন্তু মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা এই অভিশাপ,.
এই অপমান,.
এই কষ্ট—.
সহজে মুছে যাবে না।.
.
কারণ মানুষ সব ভুলে যায়,.
কিন্তু অসহায়ের সামনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া মানুষকে সহজে ক্ষমা করে না।.
লেখা : সামসিল আরিফিন. .
Ajker Bogura / TMN
আপনার মতামত লিখুন: