• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ৩০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের শিল্পখাত


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০:৩৫ এএম
জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত চট্টগ্রামের শিল্পখাত

চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কম উৎপাদন ও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।.

.

প্রতীকী ফাইল ছবি: সংগৃহীত.

.

ডিজেল সরবরাহে সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কম উৎপাদন ও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।.

বন্দরনগরীতে অন্তত ছয়টি কারখানা পরিচালনা করে শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানের ভারী যন্ত্রপাতি চালু রেখে উৎপাদন বজায় রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।.

তবে কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে তারা প্রতিদিন মাত্র ১৮ হাজার থেকে ২৭ হাজার লিটার ডিজেল পাচ্ছেন।.

এই ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে।.

বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "ইস্পাত কারখানার মতো ভারী শিল্পের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অধিকাংশ যন্ত্রপাতি ডিজেলে চলে। আমরা প্রয়োজনীয় পরিমাণের অর্ধেকও পাচ্ছি না, ফলে আমাদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।".

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ সংকট চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে—যা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সৃষ্ট মূল্যচাপকে আরও বাড়িয়ে দেবে।.

তিনি আরও বলেন, "এই পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে আমাদের পণ্যের দাম বাড়াতে হয়েছে। সংকট অব্যাহত থাকলে নির্মাণ খাতেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।".

শিল্পখাতে বিস্তৃত প্রভাব.

বিএসআরএম একা নয়। ভারী যন্ত্রপাতি—যেমন ক্রেন, ফর্কলিফট, জেনারেটর ও এক্সকাভেটর—চালাতে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের সংকটে পড়েছে।.

সীতাকুণ্ডে অবস্থিত পরিবেশবান্ধব জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান আরব শিপ রিসাইক্লিং লিমিটেডেও জ্বালানি সংকটে কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেন ও উইঞ্চ মেশিনের ওপর নির্ভরশীল—যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহৃত হয়।.

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নূর উদ্দিন রুবেল জানান, আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করে ইয়ার্ড আধুনিকায়নে তারা ৭০ কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।.

তিনি বলেন, "আমাদের মাসে প্রায় ১৮ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন, কিন্তু মার্চে পেয়েছি মাত্র ৯ হাজার লিটার—যা চাহিদার অর্ধেক। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আমাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে হতে পারে, এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।".

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর মার্চের প্রথম থেকে শুরু হওয়া এই জ্বালানি সংকট প্যানিক বায়িংয়ের কারণে আরও তীব্র হয়েছে, ফলে চাহিদা পৌঁছেছে প্রায় দ্বিগুণে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, এতে কিছু খাতে সরবরাহ হয়েছে আরও সীমিত।.

চাপে তৈরি পোশাক খাত.

দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক শিল্পও চাপের মুখে পড়েছে, বিশেষ করে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।.

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় উৎপাদন সচল রাখতে কারখানাগুলো সাধারণত ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে। তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির সীমিত সরবরাহের কারণে এখন লোডশেডিংয়ের সময় অনেক কারখানাকেই কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে।.

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির জ্যেষ্ঠ সদস্য এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, "গার্মেন্টস কারখানাগুলো নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ করে, এখানে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ।".

তিনি আরও বলেন, "লোডশেডিংয়ের সময় কারখানা চালু রাখা না গেলে শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়, যাতে করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা যায়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে—যেখানে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অর্ডার হারাচ্ছে।".

এদিকে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ইতোমধ্যেই সরকারকে চিঠি দিয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।.

এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, "এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পোশাক খাত আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।".

সংকটের অভিযোগ অস্বীকার কর্তৃপক্ষের.

শিল্পখাতের অভিযোগের পরও রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।.

পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোফিজুর রহমান জানান, গ্রাহকদের পূর্ববর্তী চাহদা ও ব্যবহার অনুযায়ী জ্বালানি বিতরণ করা হচ্ছে।.

তিনি বলেন, "গত বছরের মার্চ মাসের ক্রয় রেকর্ডের ভিত্তিতে গ্রাহকদের সাপ্তাহিক ও মাসিক চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তাই সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ ঠিক নয়।".

রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি আমদানিকারক ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর কর্মকর্তারাও একই কথা বলছেন।.

বিপিসি-এর মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) জাহাঙ্গীর কবির জানান, চলতি মাসে ইতোমধ্যে দেশে ১ লাখ ৭৬ হাজার ২০২ টন ডিজেল এসেছে। আরও প্রায় ৫৪ হাজার টন ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ পথে রয়েছে।.

এছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ২০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহে আরও ৭ হাজার টন আসার কথা রয়েছে।.

তিনি বলেন, "আগামী অন্তত তিন সপ্তাহের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছি, সামনে আরও চালান আসার কথা রয়েছে।".

তিনি ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি না কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। এতে করে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।.

.

Ajker Bogura / Md Shourov Hossain

জাতীয় বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ