ইরানের সাথে যুদ্ধের ছক আঁকতে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক কমান্ডাররা বৈঠকে বসেন, তখন তারা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সামরিক দপ্তর ও পারমাণবিক স্থাপনার মতো লক্ষ্যবস্তুগুলোর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে শুরু থেকেই এটি স্পষ্ট ছিল যে একটি ভয়ংকর মিশনের দায়িত্ব থাকবে ইসরায়েলের ওপর: ইরানি নেতাদের খুঁজে বের করা এবং হত্যা করা।.
ইসরায়েল এই দায়িত্বটি চরম ও নির্মম দক্ষতার সাথে পালন করছে। যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৫০ জনেরও বেশি 'জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা'কে হত্যা করেছে তারা—এমনটিই দাবি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর। সবশেষ আঘাতটি আসে গত বৃহস্পতিবার, যখন ইসরায়েল জানায় তারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ-কমান্ডারকে হত্যা করেছে।.
ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, শীর্ষ নেতাদের খতম করার এই মিশন মূলত কয়েক দশকের গড়া এক বিশেষ গুপ্তহত্যা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তবে গত কয়েক বছরে এই ব্যবস্থাকে আমূল বদলে ঘাতক নিপুণতার এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।.
কর্মকর্তারা ইরানের ভেতরে অসংখ্য উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন—যাদের মধ্যে ইসরায়েলের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করা প্রশাসনের ভেতরকার ব্যক্তিরাও রয়েছেন। এছাড়া ইরানের রাস্তার ক্যামেরা, পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোতে সাইবার অনুপ্রবেশের মাধ্যমে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুর ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। এই বিপুল তথ্যের ভাণ্ডার বিশ্লেষণ করতে ইসরায়েল এক নতুন ও অত্যন্ত গোপনীয় 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, যা নেতাদের জীবনযাত্রা ও চলাফেরার গতিবিধি থেকে বিভিন্ন সূত্র খুঁজে বের করতে পারে।
গাজা, লেবানন ও ইরানের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত ইসরায়েলের এই 'টার্গেটেড কিলিং' বা লক্ষ্যভেদী হত্যার কৌশলকে আরও শাণিত করেছে। কখনো তারা মাসখানেক আগে পেতে রাখা বোমা ফাটায়, আবার কখনো ড্রোন দিয়ে নিখুঁত নিশানায় অ্যাপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে আঘাত হানে।.
এই অভিযানের দায়িত্ব কেন ইসরায়েলকে দেওয়া হলো—এমন প্রশ্নে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, 'তাদের টার্গেট করার প্রয়োজন ছিল। এবং আমরা সেটি করতে পারি।'.
তবে এই চলমান শীর্ষ নেতা হত্যার অভিযানে ইসরায়েলকে তার মূল যুদ্ধলক্ষ্যগুলো অর্জনে কতটা সক্ষম করবে তা এখনো অস্পষ্ট। এখন পর্যন্ত সেই লক্ষ্যগুলো—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রক্সি বাহিনীর হুমকি নির্মূল করা, পারমাণবিক অস্ত্রের পথ বন্ধ করা এবং শাসনব্যবস্থাকে পতনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া—অধরাই রয়ে গেছে। নিহত নেতাদের জায়গায় প্রায়ই আরও কট্টরপন্থীরা স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন এবং বোমাবর্ষণের মধ্যেও ইরানে কোনো বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দানা বাঁধেনি।.
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যারিয়েল লেভিট বলেন, 'পুরো বিষয়টি এমন একটি ধারণা তৈরি করছে যে—যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নোংরা কাজগুলো করার জন্য ইসরায়েলের ওপর নির্ভর করছে।' মার্কিনিদের অবস্থান অনেকটা এমন যে, 'আমরা তাদের হত্যা করতে পারি না, কিন্তু তোমরা করলে আমরা খুশি।'.
অভিযানের সাথে পরিচিত একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, নেতাদের ওপর হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের দায়িত্ব মূলত একটি সমঝোতার প্রতিফলন। তিনি বলেন, 'এক্ষেত্রে আমরা একসাথে কাজ করছি কিন্তু আমাদের নিজস্ব লক্ষ্য রয়েছে।'.
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, দায়িত্ব বণ্টনটি উভয় পক্ষের সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে, কোনো আইনি বাধার কারণে নয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, যার মধ্যে ২০২০ সালে ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনাও রয়েছে।.
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাগুলোকে যৌথ উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, 'আমরা তাদের পুরো নেতৃত্বকে হত্যা করেছি। এরপর তারা নতুন নেতা বেছে নিতে বসেছিল, আর আমরা তাদেরও সবাইকে হত্যা করেছি।'.
তিনি আরও দাবি করেন, শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, কারণ 'এখনকার নেতারা শুরুতে যাদের সঙ্গে আমরা ছিলাম, তাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।'.
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক বিমান হামলায় নিহত হন ২৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এছাড়া ওই হামলায় ইরানের ডিফেন্স কাউন্সিলের প্রধান, আইআরজিসি কমান্ডার, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং আরও এক ডজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন।.
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গত প্রায় এক বছর ধরে 'গ্রুপ অব ফাইভ'—যার মধ্যে খামেনি ও তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা রয়েছেন—তাদের বৈঠকগুলোর ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল।.
একজন ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, 'প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তারা বৈঠকে বসত। কখনো ভিন্ন ভিন্ন স্থানে, কখনো বেশি নিরাপত্তাবেষ্টিত জায়গায়, আবার কখনো কম নিরাপত্তার মধ্যে।'.
কর্মকর্তাদের মতে, এই গোয়েন্দা তথ্য এতটাই নির্ভরযোগ্য ছিল যে জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর আগেই ওই গ্রুপের ওপর হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় আনা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমঝোতার কারণে বিষয়টি তখন স্থগিত রাখা হয়, কারণ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ছিল মূল লক্ষ্য।.
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, হত্যার সময় আয়াতুল্লাহ খামেনি তার বাসভবনের উপরের একটি তলায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন।.
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার ছেলে মোজতবা খামেনিও ওই কমপাউন্ডে ছিলেন এবং গুরুতর আহত হন। তবে পাশের একটি বাগানে চলে যাওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। হামলায় তার স্ত্রী ও কন্যা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।.
বাবার মৃত্যুর পর থেকে কনিষ্ঠ খামেনির নেতৃত্বের ভূমিকা সীমিত। এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, 'তিনি মাঝে মাঝে সিদ্ধান্ত নেন।' ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনায় ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সম্পৃক্ততার অনুমোদনও তিনিই দিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার কারণে তাকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।.
কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ পরিকল্পনার শুরুতেই 'গ্রুপ অব ফাইভ'-এর ওপর হামলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।.
তবে শেষ মুহূর্তে হামলার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। কারণ, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় নির্ধারিত বৈঠকটি সকালে এগিয়ে আনা হয়েছিল।.
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দোরগোড়ায় যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, যেগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যে তেহরানে পৌঁছাতে সক্ষম ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা দূরের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানই নেতৃত্ব কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।.
এই অভিযানের পেছনে রয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং আইডিএফ-এর বিশেষ সাইবার শাখা 'ইউনিট ৮২০০'। দুটি সংস্থার অফিস তেল আবিবের উত্তরের পাড়ায় শপিং মল ও সিনেমা হলের কাছে অবস্থিত। বাইরের দৃশ্য শান্ত আবাসিক এলাকা মনে হলেও, সেখানে সেনাবাহী বাস, শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দূরে নজরদারি টাওয়ার চোখে পড়ে। .
ইসরায়েলের গোয়েন্দারা মার্কিন সিআইএ ও এনএসএ-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করে আসছেন, বিশেষ করে ইরানকে লক্ষ্য করে গোপন অভিযান চালাতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১০ সালে প্রকাশিত 'স্টাক্সনেট' সাইবার হামলা, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছিল।.
কিন্তু বর্তমান হামলায় ব্যবহৃত অনেক সাইবার ও গোয়েন্দা প্রযুক্তি মূলত পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল সাইবার সংঘর্ষের ফল। ইরান ইসরায়েলের পানি সরবরাহ ও অন্যান্য সিস্টেমে আক্রমণ চালানোর পর, ইসরায়েল পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। তারা তেহরানের ট্রাফিক সিগন্যাল অচল করে যানজট সৃষ্টি করে, গ্যাস স্টেশনগুলোর ইলেকট্রনিক সিস্টেম ভেঙে দেয় এবং বাসিজ মিলিশিয়ার সদস্যদের এটিএম থেকে টাকা তুলতে বাধা দেয়।.
কর্মকর্তাদের মতে, যেগুলো দেখতে সাধারণ পদক্ষেপ ছিল, তার আড়ালে ইউনিট ৮২০০ একটি বড় সাইবার অভিযান চালাচ্ছিল। এ অভিযান মূলত ইরানের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রবেশ করার জন্য। এক জ্যেষ্ঠ আইডিএফ কর্মকর্তা বলেন, 'যেখানে প্রবেশ করা যেত, আমরা চেষ্টা করেছি—ফোন কল, ট্রাফিক ক্যামেরা, এমনকি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সিস্টেমও।'.
লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল এমন ডাটাবেস, যেখানে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী নেতাদের জন্য আশ্রয়স্থল সম্পর্কিত তথ্য রাখত। কর্মকর্তা বলেন, 'কখনও আমরা আইআরজিসি'র গোয়েন্দা শাখার, কখনও সেনাবাহিনী বা পুলিশের ডাটাবেস থেকে তথ্য পেয়েছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও বেশি তথ্য সংগ্রহে সক্ষম হয়েছি।'.
ইরানের অতি-সতর্কতা এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের চেষ্টাই তাদের জন্য বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় হাব বা ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করতে শুরু করে, যাতে সরকার চাইলে যেকোনো সময় ইন্টারনেটের 'কিল সুইচ' ব্যবহার করতে পারে। যুদ্ধের শুরু থেকেই নাগরিকদের যোগাযোগ এবং তথ্য পাওয়ার পথ বন্ধ করতে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে দেশটির সরকার।.
তবে এটি করার ফলে খোদ প্রশাসনের সদস্য ও নেতাদের যোগাযোগও ওই একই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় চলে আসে। সাবেক এক পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, 'একটি গোপন সাইবার অনুপ্রবেশ ইসরায়েলি এজেন্টদের জন্য এক শক্তিশালী সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ইরানি রক্ষী, উপদেষ্টা এবং তাদের স্বজনদের ইমেইল, মেসেজ ও ফোন কল অনায়াসেই সংগ্রহ করতে পারছে।' .
ইরান অবশ্য দ্রুত এই দুর্বলতাগুলো দূর করার চেষ্টা করেছে। ইসরায়েলি নজরদারিতে নেতাদের চলাফেরা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গত বছর নিরাপত্তারক্ষীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয় তেহরান। কর্মকর্তারা জানান, ইরানের এই নতুন সতর্কতা ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের সংগ্রহে কিছুটা বিঘ্ন ঘটিয়েছিল, তবে তা ছিল সাময়িক।
একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, কর্মক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও 'ডিউটি শেষ হওয়া মাত্রই কর্মীরা তাদের ফোন চেক করে। আসলে কেউই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না।' .
ইরান থেকে সংগৃহীত তথ্যের এই বিশাল পাহাড় থেকে নেতাদের অবস্থান ও আচরণের সূত্র খুঁজে বের করতে ইসরায়েল একটি নতুন এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা একে গত দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকলে এসব গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব অনেক কম হতো।.
ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিষয়ক গবেষণার পরিচালক এবং আইডিএফ-এর সাবেক কর্মকর্তা রাজ জিমত বলেন, 'এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ইসরায়েল এমন সব তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে যা সবসময়ই হাতে ছিল, কিন্তু আগে তা প্রসেস করা বা বিশ্লেষণ করা ছিল অসম্ভব।' .
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় এই সক্ষমতার প্রথম ঝলক দেখা গিয়েছিল। সে সময় ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামোর পাশাপাশি দেশটির সামরিক নেতাদের ওপর একযোগে হামলা চালায়।.
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট কিছু কমান্ডারের বিষয়ে তাদের গোয়েন্দা তথ্য এতটাই নিখুঁত ছিল যে, লক্ষ্যবস্তুর নড়াচড়া দেখে ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ মাঝ-আকাশেই বদলে দেওয়া হতো। এর একটি উদাহরণ হলো গত ১৩ জুনের একটি হামলা। সেদিন আইআরজিসি মহাকাশ বাহিনীর কমান্ডার আমির আলী হাজিজাদেহ যখন একটি অফিস থেকে পাশের একটি অ্যাপার্টমেন্টে যাচ্ছিলেন, তখন ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানা সে অনুযায়ী সমন্বয় করে তাকে সরাসরি আঘাত করা হয়েছিল।.
ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য যে সব সময় শতভাগ নিখুঁত ছিল, তা কিন্তু নয়। এর একটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় গত মার্চের শুরুতে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইর উত্তরসূরি কে হবেন—তা নিয়ে আলোচনা করতে কোমের 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস'-এর সদর দপ্তরে কয়েক ডজন সদস্যের সমবেত হওয়ার কথা ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইসরায়েল ওই ভবনে বোমাবর্ষণ করে। ভবনটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলেও কমিটির সদস্যরা অক্ষত থেকে যান। .
কারণ, তারা সশরীরে উপস্থিত না হয়ে অনলাইনে বৈঠকটি করছিলেন। ইসরায়েলের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার দাবি, হামলাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈঠকটি ভণ্ডুল করা, সদস্যদের হত্যা করা নয়।.
বিগত দশকগুলোতে গুপ্তহত্যা চালাতে ইসরায়েল নানা ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মোটরসাইকেলে করে এসে ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের গাড়িতে বোমা লাগিয়ে দেওয়া কিংবা ২০২৪ সালে তেহরানে আইআরজিসি-র একটি গেস্ট হাউসে বোমা লুকিয়ে রেখে সেখানে সফররত এক হামাস কমান্ডারকে হত্যা করা। তবে ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান অভিযানে ইসরায়েল মূলত যুদ্ধবিমান এবং ড্রোনের ওপরই বেশি নির্ভর করছে। যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ায় ইসরায়েলি ড্রোনগুলো এখন নিয়মিত বিরতিতে দেশটির আকাশে টহল দিচ্ছে।.
এই অভিযানের সফলতার পেছনে ইরানি নেতাদের কিছু ব্যাখ্যাতীত 'ভুল' বা গাফিলতিকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। যুদ্ধের প্রথম হামলার চার সপ্তাহ পরও তারা বিস্ময় প্রকাশ করছেন এই ভেবে যে—যখন কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র গত দুই দশকের মধ্যে এই অঞ্চলে তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি মোতায়েন সম্পন্ন করেছে, সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে খামেনেই এবং তার শীর্ষ সহযোগীরা কেন তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?.
আগের বছরের ১২ দিনের যুদ্ধেই ইরানের অনেক জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতা নিহত হয়েছিলেন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকার পরও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনি এবং অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা কেন সুরক্ষার জন্য শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লেন না কিংবা মাটির নিচে তৈরি করা সুড়ঙ্গ বা বাঙ্কারে আশ্রয় নিলেন না, তা এক বড় প্রশ্ন। এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষায়, 'এর কোনো ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই। পৃথিবীর যেকোনো সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছিল যে সামনে এক ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ধেয়ে আসছে।' . .
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: