প্রাণ-আরএফএল ইতোমধ্যে হবিগঞ্জ কারখানায় আরওয়াইডিও ইলেকট্রিক স্কুটারের উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেছে। সেখানে প্রায় ১,০০০ মানুষ সরাসরি কাজ করছেন।.
.
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে প্রবেশ করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। আগামী তিন বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে একটি উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।.
দেশের শীর্ষ এই শিল্পগোষ্ঠী প্রচলিত মোটরসাইকেল ও বৈদ্যুতিক দুই চাকার যান—উভয় খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নিজেদের ইলেকট্রিক স্কুটার ব্র্যান্ড আরওয়াইডিও-এর উৎপাদন ও বিপণনের পাশাপাশি জনপ্রিয় টিভিএস ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও বিতরণ করবে তারা।.
কোম্পানির কর্মকর্তাদের মতে, হবিগঞ্জে কারখানা স্থাপনের কাজ শিগগিরই শুরু হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি দেশজুড়ে আধুনিক বিপণন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। বিক্রয়-পরবর্তী সেবা শক্তিশালী করতেও বিনিয়োগ করা হবে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক দুই চাকার যানবাহনের বাজারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিক্রয়-পরবর্তী সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।.
প্রাণ-আরএফএল ইতোমধ্যে হবিগঞ্জ কারখানায় আরওয়াইডিও ইলেকট্রিক স্কুটারের উৎপাদন ও বিপণন শুরু করেছে। সেখানে প্রায় ১,০০০ মানুষ সরাসরি কাজ করছেন। কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছালে আরও ১,০০০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে। সরবরাহকারী, পরিবেশক ও সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে আরও প্রায় ৩,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।.
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, এই সিদ্ধান্ত বিশেষ করে তরুণদের পরিবর্তিত ভোক্তা চাহিদার প্রতিফলন। তিনি বলেন, 'মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল এখন আর শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এগুলো লাইফস্টাইল পণ্যে পরিণত হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যের বাইসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনে প্রাণ-আরএফএলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মোটরসাইকেল ও ইলেকট্রিক স্কুটার খাতে প্রবেশের ভিত্তি তৈরি করেছে।.
টিভিএস-এর দায়িত্ব গ্রহণ.
সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি দুই কোম্পানির মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাংলাদেশে টিভিএস মোটরসাইকেলের দায়িত্ব নিয়েছে প্রাণ-আরএফএল।.
পাল বলেন, শিগগিরই হবিগঞ্জ কারখানায় 'মেড ইন বাংলাদেশ' পণ্য হিসেবে টিভিএস মোটরসাইকেল স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হবে।.
ভারতীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সহায়তায় টিভিএস উৎপাদনের জন্য পর্যায়ক্রমে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে।.
পাল বলেন, 'নতুন মডেল, উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম এবং আরও ভালো বিক্রয়-পরবর্তী সেবার মাধ্যমে আমরা এই ব্র্যান্ডটিকে আবার শীর্ষ অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে চাই।'.
আরএফএলের বাইক ব্যবসার প্রধান অপারেটিং কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ প্রাণ-আরএফএলের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টিভিএস মোটরসাইকেলের বিপণন শুরু হবে। চলতি বছরের মধ্যেই হবিগঞ্জে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে কারখানাটি প্রতি মাসে প্রায় ৫,০০০ ইউনিট উৎপাদন করবে। ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।.
ভারতের অন্যতম শীর্ষ মোটরসাইকেল নির্মাতা টিভিএস মোটর কোম্পানি বহু বছর ধরে বাংলাদেশের দুই চাকার যানবাহনের বাজারে সক্রিয় রয়েছে। টিভিএস স্টার সিটি প্লাস, টিভিএস এপাচি সিরিজ এবং কমিউটার বাইক শহর ও গ্রামের চালকদের কাছে জনপ্রিয়।.
এখন পর্যন্ত এই ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল র্যাংগস মোটরস আমদানি ও বিতরণ করত। তবে খণ্ডিত বিতরণব্যবস্থা এবং বিক্রয়-পরবর্তী সেবার ধারাবাহিকতার অভাবে শক্তিশালী খুচরা নেটওয়ার্ক থাকা প্রতিযোগীদের তুলনায় টিভিএস প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এখন প্রাণ-আরএফএল বিপণন ও ভবিষ্যৎ স্থানীয় উৎপাদনের দায়িত্ব নেওয়ায় বিস্তৃত বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায় ব্র্যান্ডটি।.
ইলেকট্রিক স্কুটারের ওপর গুরুত্ব.
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবেশগত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে প্রাণ-আরএফএল ইলেকট্রিক স্কুটারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এগুলোকে ভবিষ্যতের বাহন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাল বলেন, ভারত, চীন ও ভিয়েতনামে ইলেকট্রিক স্কুটার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর উল্লেখযোগ্য চাহিদার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উচ্চমূল্যের কারণে প্রবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে।.
২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৫০,০০০ টাকায় আরওয়াইডিও ইলেকট্রিক স্কুটার বাজারে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য পণ্যটি সহজলভ্য করতে চায় তারা। হবিগঞ্জে ৫০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগে আরওয়াইডিও স্কুটারের উৎপাদন ও সংযোজন শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশ যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হচ্ছে। আরও ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে এক বছরের মধ্যে স্থানীয় যন্ত্রাংশের হার প্রায় ১০০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।.
মাহমুদুর রহমান বলেন, কারখানাটি বর্তমানে মাসে প্রায় ৫০০টি আরওয়াইডিও স্কুটার উৎপাদন করছে। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হলে তা বেড়ে ৩,০০০ ইউনিটে পৌঁছাবে।.
ইলেকট্রিক দুই চাকার যানের ক্ষেত্রে চার্জিং অবকাঠামো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে পাল বলেন, জাপান-সমর্থিত স্টার্টআপ গ্লাফিট বাংলাদেশ লিমিটেড-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে প্রাণ-আরএফএল তাদের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ফাস্ট-চার্জিং স্টেশন স্থাপন করছে। এ উদ্যোগ ইভি বা বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।.
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও প্রবৃদ্ধির কৌশল.
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বাংলাদেশের মোটরসাইকেলের বাজারের আকার ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ কোটি টাকা। বাজারটি বছরে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। দেশে বিক্রি হওয়া মোটরসাইকেলের প্রায় ৯৯ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা সংযোজিত। সুবিধাজনক সরকারি নীতি এবং শহর ও মফস্বলে যাতায়াতের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।.
গত এক দশকে মোটরসাইকেলের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে বছরে ২,০০,০০০ ইউনিটের কম বিক্রি হতো। বর্তমানে তা বেড়ে বছরে প্রায় ৪,০০,০০০ ইউনিটে পৌঁছেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে শিল্পের সক্ষমতা ১০ লাখ ইউনিটে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।.
ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পেও সম্ভাবনা দেখছে প্রাণ-আরএফএল। পাল বলেন, প্লাস্টিক, ধাতু ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে আরএফএলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ড্রাইভ চেইন, সিট, স্ট্যান্ড, চাকা ও ব্যাটারির মতো যন্ত্রাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি করা সম্ভব।.
কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেন, প্রথম বছরে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। ডিলার ও সার্ভিস নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং শক্তিশালী গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে লক্ষ্য থাকবে প্রচলিত ও বৈদ্যুতিক—উভয় ধরনের দুই চাকার যানের বাজারে শীর্ষস্থান অর্জন।.
Ajker Bogura / Md.Showrov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: