গত ১০ বছরে মশা নিধন কর্মসূচি ও কীটনাশক কেনায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই সিটি কর্পোরেশন মোট ১,০১২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। তবুও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঢাকায় মশা নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি।.
মশা নিয়ন্ত্রণে বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণে অর্থ ব্যয় করা হলেও ঢাকায় কিউলেক্স মশার উপদ্রব কমেনি। বরং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মশার ঘনত্ব হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করছেন নগরবাসী। .
কল্যাণপুর, গাবতলি থেকে খিলগাঁও, উত্তরা ও পুরান ঢাকা—রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।.
মঙ্গলবার দুপুরে কল্যাণপুর নতুন বাজার এলাকার এক মুদি দোকানে অন্তত তিনটি স্থানে মশার কয়েল জ্বালিয়ে পণ্য বিক্রি করছিলেন রাসেল জনি। এরপরও মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে তাকে বারবার শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে নড়াচড়া করতে দেখা যায়। .
এসময় রাসেল জনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "গত কয়েকদিন ধরে মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, দিনেও মশার কয়েল জ্বালিয়েও রক্ষা পাওয়া যায় না। সন্ধ্যা থেকে তো দোকানে ক্রেতারা এসে দাঁড়াতেই পারেন না মশার কারণে। তাই অনেক সময় সন্ধ্যার মধ্যেই দোকান বন্ধ করে চলে যাই। বাসায়ও মশা থেকে রক্ষা নেই। তাই বাসার জানালাগুলো জাল দিয়ে ঘিরে দিয়েছি।".
শুধু রাসেল জনিই নন—রাজধানীর কল্যাণপুর, গাবতলি, মিরপুর, খিলক্ষেত, উত্তরা, বেড়িবাঁধ এলাকা, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, যাত্রাবাড়ি, পুরান ঢাকা, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া ও শ্যামপুরসহ প্রায় পুরো ঢাকাবাসীই কিউলেক্স মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন।.
স্বল্পস্থায়ী শীত ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিতে মশার উপদ্রব বেড়েছে: বিশেষজ্ঞরা.
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের শীতকাল দীর্ঘ সময় স্থায়ী না হওয়ায় কিউলেক্স মশা জন্মানোর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কীটতত্ত্ববিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৯২ শতাংশ কিউলেক্স, ০.৫ শতাংশ এডিস এবং প্রায় ৭ শতাংশ অন্যান্য প্রজাতির মশা রয়েছে।.
শীত দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মশক নিধনে সিটি কর্পোরেশনের সমন্বয়হীনতা, ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়া এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ স্থগিত থাকায় এবার কিউলেক্স মশার প্রাদুর্ভাব বেশি বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।.
দীর্ঘদিন সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশক নিধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।.
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার টিবিএসকে বলেন, "ঢাকায় প্রতিনিয়তই কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে যাচ্ছে, যা মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। বড় ধরনের ঝড় ও বৃষ্টিপাত না হলে মশার উপদ্রব সহজে কমবে না।" .
তিনি বলেন, "রাজধানীর সর্বত্র সমানভাবে মশা নেই। ঢাকার পেরিফেরি এলাকা যেমন মুগদা, মান্ডা, খিলগাঁও, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও রাজধানী-সংলগ্ন সাভার এলাকায় লার্ভা ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার ঘনত্ব বেশি। অন্যদিকে শাহবাগ, ফার্মগেট ও পরীবাগের মতো মধ্যাঞ্চলে তুলনামূলক কম।".
তিনি আরও বলেন, "জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে এবং তা ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৯২ শতাংশ মশা কিউলেক্স এবং এডিস প্রায় ০.৫ শতাংশ।".
মশা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শীতের তীব্রতা কম ও স্থায়িত্ব কম থাকা, ড্রেন, খাল, লেক ও জলাশয়ের দূষণ যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা এবং সিটি কর্পোরেশনে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে ঢিলেমি—এসব বিষয় দায়ী।.
তবে কার্যকর মশক নিধন ব্যবস্থা না নিলে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর এডিস মশা দ্রুত বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি। .
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, "আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়লে এডিস মশার বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে। বৃষ্টির পানি জমে থাকলে সেখানে এডিসের লার্ভা জন্মাবে। এজন্য মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের বিকল্প নেই।". .
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: