• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ০৩ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: বাংলাদেশের রপ্তানিতে নতুন হুমকি


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:০৩ এএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: বাংলাদেশের রপ্তানিতে নতুন হুমকি

বাংলাদেশের রপ্তানি টানা সাত মাস ধরে নেতিবাচক প্রবণতায় রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে চাহিদা কমে যাওয়ায় চাপ বাড়ছিলই। এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনৈতিক সংকট রপ্তানিখাতে আরেক দফা ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি করেছে।.

২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার—মোট রপ্তানির মাত্র ২ শতাংশ। কিন্তু খাতভিত্তিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এই রপ্তানির ৬০ শতাংশেরও বেশি তৈরি পোশাক, বাকিটা মূলত শাকসবজি ও কৃষিপণ্য। ফলে অত্র অঞ্চলে রপ্তানিতে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত শিল্পপণ্য ও পচনশীল পণ্যের চালান—দুই ধরনের রপ্তানিতেই আঘাত হানতে পারে।.

রপ্তানিকারকদের বড় উদ্বেগের হচ্ছে হরমুজ প্রণালি  নিয়ে, যেটি পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত সরু কিন্তু অত্যন্ত এক কৌশলগত সামুদ্রিক করিডর। বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের একটি বড় অংশ এ পথ দিয়ে যায়, যা বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রবাহকেও প্রভাবিত করে। সংঘাত আরও বাড়লে বা নৌপথে চলাচল বন্ধ হলে এর প্রভাব শুধু চালানের বিলম্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না।.


ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস
এই প্রেক্ষাপটে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কেবল একটি বিমানবন্দর নয়; এটি বৈশ্বিক সংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—যা এশিয়াকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত করে। ঢাকা–লন্ডন, সিঙ্গাপুর–ফ্রাঙ্কফুর্ট কিংবা নাইরোবি–নিউইয়র্ক—অসংখ্য দীর্ঘপাল্লার রুট সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপসাগরীয় আকাশসীমা ও ট্রানজিট হাবের ওপর নির্ভরশীল। যখন এই সংযোগ দুর্বল হয়, তখন ফ্লাইটগুলোকে নিতে হয় দীর্ঘ রুট, যাতে বাড়তি জ্বালানি খরচ হয়, সূক্ষ্মভাবে সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্কে ব্যাঘাত ঘটে।.

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এ ঝুঁকির আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংঘাত-প্রভাবিত আকাশপথ এড়িয়ে চলতে বাণিজ্যিক এয়ারলাইনগুলো ইতোমধ্যে কিছু ফ্লাইট স্থগিত বা পুনর্নির্ধারণ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নপথ অতিক্রম করায় মধ্য এশিয়ার কিছু এয়ার করিডর সাময়িকভাবে পাতলা হয়ে গেছে,  বা ফ্লাইট চলাচল কমে গেছে—ফলে বিকল্প রুটে চাপ বেড়েছে।.

অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ এখানে নির্মম। বিকল্প আকাশ বা নৌপথে ঘুরে যেতে হলে জ্বালানি খরচ বাড়ে—আর সেই সময়েই তেলের বাজার স্নায়ুচাপে আছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার কারণে। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল যে নৌপথ দিয়ে যায়, সেখানে বিঘ্নের আশঙ্কাই তেলের বাজারে দামের ধাক্কা তৈরি করতে যথেষ্ট।.

যদি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি বা তার উপরে ওঠে; আর একই সঙ্গে এয়ারলাইন ও কার্গো অপারেটররা দীর্ঘ বিকল্প রুটে পণ্য পরিবহনে বাধ্য হয়, তাহলে খরচ কাঠামোর দ্রুত অবনতি ঘটে। তখন জ্বালানি খরচ বেড়ে যায়, বীমা প্রিমিয়াম বাড়ে, ফ্রেইট চার্জ ঊর্ধ্বমুখী হয়, টিকিটের দাম বেড়ে যায় এবং সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ ও জটিল হয়ে ওঠে।.

বাংলাদেশের প্রধান বাজারগুলোতে চাহিদা ইতোমধ্যেই মন্থর; তারমধ্যে আমাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এসবের প্রভাব বহুগুণ হয়ে দ্রুতই দেখা দিতে পারে।.

বিমানবন্দরে পচনশীল পণ্য নষ্ট হচ্ছে.

রপ্তানিকারকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট হঠাৎ স্থগিত হওয়ায় ইতোমধ্যে আর্থিক ক্ষতি শুরু হয়েছে। পচনশীল পণ্য বিমানবন্দরে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, আর এয়ার কার্গো অনিশ্চয়তায় নতুন চালানও বন্ধ রাখতে হচ্ছে।.

চট্টগ্রামভিত্তিক গ্রিন ওয়ার্ল্ড ইমপ্যাক্ট শনিবার সকালে প্রায় এক টন তাজা সবজি দুবাই পাঠাতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির অন্যতম গন্তব্যও দুবাই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধের জেরে অধিকাংশ মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় চালানটি আটকে যায়। শেষ পর্যন্ত পণ্যগুলো নষ্ট হয়ে প্রায় ১,২০০ ডলারের ক্ষতি হয়।.

প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ মাহবুব রানা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, আকস্মিক এই বিঘ্নের জন্য তারা একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বলেন, "প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে আকাশপথে প্রায় আড়াই লাখ ডলারের তাজা ফল-সবজি রপ্তানি হয়। শনিবারের ফ্লাইট বাতিলের পর রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা অধিকাংশ সবজি নষ্ট হয়েছে। ফ্লাইট অনিশ্চিত থাকায় গত দুই দিন নতুন চালান প্রস্তুত বন্ধ রাখা হয়েছে।".

রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্যগামী ফ্লাইটগুলো স্থগিত থাকায় চট্টগ্রাম থেকে সবজি রপ্তানি কার্যত থেমে গেছে।.

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ–এর পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সতর্ক করে বলেন, "এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আমাদের রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। শুধু কৃষিপণ্য নয়—মধ্যপ্রাচ্যের হাব হয়ে ইউরোপে যাওয়া পণ্যের ট্রানজিটও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।".

তৈরি পোশাকেও অচলাবস্থা.

বার্ষিক ৩০ কোটি ডলার টার্নওভারের শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, " "আমার কিছু পোশাক পণ্য ঢাকা এয়ারপোর্টে আটকে আছে, যা দুবাই এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে এয়ার কার্গের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুবাই এয়ারপোর্ট বন্ধ হওয়ায় বিপদে পড়ে গেছি।".

তিনি আরও বলেন, "বিকল্প ছিল দিল্লি এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে পাঠানো, কিন্তু দিল্লি এয়ারপোর্ট আমাদের জন্য সেই সুবিধা আগেই বন্ধ করে দিয়েছে। এখন যদি হংকং হয়ে পাঠাতে হয়, তাহলে খরচ বেড়ে যাবে।".

শোভন হতাশা ব্যক্ত বলেন,"এই ঘটনা আমাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।".

পোশাক রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা শীর্ষ একটি বৈশ্বিক রিটেইলার ইন্ডিটেক্স তাদের আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ নিজ খরচে এয়ারকার্গোর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নেয়, যা মূলত দুবাই এয়ারপোর্টকে ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহার করে। কিন্তু দুবাই এয়ারপোর্ট বন্ধ হওয়ায় তাদের এ উপায়ে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।.

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইন্ডিটেক্স-এর ঢাকা অফিসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "দুবাই এয়ারপোর্ট বন্ধ হওয়ায় আমরা বাংলাদেশ থেকে পণ্য পাঠাতে পারছি না।".

"আমরা এখন ডেটা সংগ্রহ করছি, কী ধরণের ক্ষতি হয়েছে"–উল্লেখ করে তিনি বলেন, "দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ হলে আমাদের সাপ্লাই চেইনে বড় ক্ষতি হবে। আমারা এখন কলম্বোসহ অন্য বিকল্প এয়ারপোর্ট বিবেচনা করছি।".

পণ্য আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের আইন বিষয়ক সম্পদক কাজী আজমল হোসেন টিবিএসকে বলেন, "আমাদের পণ্য বিমানবন্দরে আটকে আছে। পাঠানো যাচ্ছে না।".

ঢাকা কাস্টমস হাউজের এক সিনিয়র কর্মকর্তাও রপ্তানি পণ্য আটকে আছে বলে জানিয়েছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ারকার্গো আটকে থাকার কারণে কী পরিমাণ চালান পাঠানো সম্ভব হয়নি, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।.

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (কার্গো) এ বি এম নাজমুল হুদা টিবিএসকে বলেন, "সৌদি আরব বাদে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে কার্গো পাঠানো যাচ্ছে না।".

পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন–বিজিএমইএ'র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইনামুল হক বাবলু বলেন, "সমুদ্রপথে পণ্য পাঠানোতে আমরা এখনো কোনো অসুবিধা দেখিনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যার কারণে এয়ারে পাঠানো যাচ্ছে না।".

তিনি বলেন, "আমরা পরিস্থিতি আরো কিছুদিন পর্যবেক্ষণের পর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিতে শুরু করব। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও বিমাবন্দর বন্ধ থাকলে সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।".

শিপিং খাতে কনটেইনার জটের আশঙ্কা.

শিপিং এজেন্টদের মতে, সংকট দীর্ঘ হলে প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক বিলম্বে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে সিঙ্গাপুর ও কলম্বোর মতো ট্রানশিপমেন্ট হাবে কনটেইনার জট তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ধীর হবে এবং বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বাড়বে।.

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবাসীকেন্দ্রিক ভোক্তা পণ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি ইতোমধ্যেই প্রভাবিত হচ্ছে। হরমুজ কৌশলগত বৈশ্বিক শিপিং করিডর; সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবাহ ও বাংলাদেশের শিপিং কার্যক্রম—উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।".

.

Ajker Bogura / Md Shourov Hossain

অর্থনীতি বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ