মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সোয়াস- এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান বলেন, অবকাঠামো চুক্তির দরে সামান্য পার্থক্যও দীর্ঘমেয়াদে শত শত মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ে রূপ নিতে পারে।.
অবকাঠামো খাতের শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন এক গবেষণা উপস্থাপনায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও অতিমূল্যায়িত মেগা প্রকল্প বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই আর্থিক চাপ তীব্র আকার ধারণের আগেই নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।.
"করাপশন ইন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন বাংলাদেশ অ্যান্ড শ্রীলংকা: ইমপ্লিকেশন্স ফর পাবলিক ডেবট" শীর্ষক এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন লন্ডনের সোয়াস (এসওএএস) ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। এতে সহায়তা দিয়েছে ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনস অ্যান্ড চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।.
ঢাকায় সিরডাপ সম্মেলনের এক সেমিনারে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়।.
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সোয়াস- এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মুশতাক খান বলেন, অবকাঠামো চুক্তির দরে সামান্য পার্থক্যও দীর্ঘমেয়াদে শত শত মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ে রূপ নিতে পারে।.
অর্থনীতিবিদরা উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো প্রকল্পে ট্যারিফ বা চুক্তিমূল্য মাত্র কয়েক সেন্ট বেশি নির্ধারণ করা হলেও প্রকল্পের পুরো আয়ুষ্কালে তার সম্মিলিত প্রভাব কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।.
তারা বলেন, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, প্রতিযোগিতা সীমিত করা এবং অতিরিক্ত দামে চুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারে।.
দুই ধরনের শাসনব্যবস্থাগত ব্যর্থতা.
গবেষকদের মতে, অবকাঠামো বিনিয়োগে দুটি বড় ধরনের শাসনব্যবস্থাগত ব্যর্থতার কারণে ঋণের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।.
প্রথমত, প্রকল্প কারিগরিভাবে সঠিক হলেও অতিমূল্যে নির্ধারিত হতে পারে। এ ধরনের সম্পদ কার্যকরভাবে পরিচালিত হলেও উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয়ের কারণে—অর্জিত রাজস্ব থেকে ব্যয় পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।.
দ্বিতীয়ত, প্রকল্প নিম্নমানের নির্মাণ, অনুপযুক্ত নকশা বা অপর্যাপ্ত পরিকল্পনার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবকাঠামো আংশিক ব্যবহৃত হয় বা প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক মুনাফা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, যা আবারও ঋণচাপ বাড়ায়।.
গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব ফলাফল কেবল কারগরি ত্রুটির কারণে ঘটেনি; বরং বহু ক্ষেত্রে তা ছিল ইচ্ছাকৃত শাসনব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন; যেখানে দুর্নীতি, রাজনৈতিক আঁতাত কিংবা নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হয়েছে।.
এ প্রেক্ষাপটে শক্তিশালী প্রয়োগব্যবস্থা (এনফোর্সমেন্ট মেকানিজম), ক্রয়প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রতি নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের আহ্বান জানানো হয়েছে।.
অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ ও ঋণ বৃদ্ধি.
২০০৮–২০০৯ সালের পর বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা উভয় দেশই অবকাঠামো-নির্ভর উন্নয়ন কৌশল বেগবান করে।.
শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ শেষে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসার আমলে বন্দর, মহাসড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু হয়।.
বিশ্লেষণে দেখা যায়, শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬৫ শতাংশই অবকাঠামো খাতে ব্যয় করা হয়েছে; তবে পরবর্তী সময়ে একাধিক প্রকল্প আংশিক ব্যবহৃত বা অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়। এতে প্রকল্পের আয় থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তা শ্রীলঙ্কার ঋণসংকটে ভূমিকা রাখে।.
একই সময়ে বাংলাদেশও সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ নির্মাণে বিস্তৃত পরিসরে বিনিয়োগ করে। ফলে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ যেখানে ছিল ২৪ বিলিয়ন ডলার, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১১২ বিলিয়ন ডলারে। একই সঙ্গে এসব ঋণের সুদ পরিশোধে এখন রাজস্ব বাজেটের ক্রমবর্ধমান অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে।.
@কেস স্টাডি: মান্নার ও গোড্ডা প্রকল্প.
প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলের মান্নার বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রাথমিকভাবে ২৫০ মেগাওয়াট সঃক্ষমতার এ প্রকল্পের আলোচনা শুরু হয় ২০২১ সালে এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই সমঝোতা স্মারক ঘোষণা করা হয়।.
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা তাদের বিদ্যুৎ আইন সংশোধন করে প্রতিযোগিতা ছাড়াই চুক্তিটি কার্যকরের সুযোগ দেয়, যেখানে আদানিকে জিটুজির অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।.
২০২২ সালের আরগ্যলয়া গণআন্দোলনের সময় এ চুক্তি কমিউনিটি সংগঠন, সংসদ সদস্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এসব ক্রমবর্ধমান চাপ ও সম্ভাব্য পুনঃআলোচনার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে আদানি প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়ায়।.
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎচুক্তির জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি) জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সঙ্গে চুক্তিমূল্য এত বেশি যে খুচরা বিদ্যুতের দাম সহনীয় রাখতে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে।.
ভর্তুকি না দিলে বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হতে পারে, যা শিল্পখাতের সংকুচিত হওয়া ও ভোক্তাদের দুর্ভোগ ডেকে আনতে পারে।.
২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদকদের বিল পরিশোধ ১১ গুণ বেড়েছে, আর ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ; অথচ প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তিসংগত মানদণ্ডের তুলনায় ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ বেশি চুক্তিমূল্য এবং দুর্বল পরিকল্পনার কারণে বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি সংকটে অচল অবস্থায় পড়ে আছে—যেগুলোকে প্রায়ই 'ঘোস্ট প্ল্যান্ট' বলা হয়।.
ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত ১,৬০০ মেগাওয়াট সঃক্ষমতার আদানির গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঝাড়খণ্ড কয়লা সমৃদ্ধ হলেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত কয়লা ব্যবহার করা হয়, আর এই কয়লার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি অতিমূল্যায়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।.
গোড্ডা থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, যার জন্য ব্যয় হয়েছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার এবং এই ব্যয়কেও বিদ্যুতের দামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।.
চুক্তিকৃত সমন্বিত ট্যারিফ নির্ধারিত হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৮ দশমিক ৬১ মার্কিন সেন্ট দরে, যেখানে ভারতের অন্যান্য উৎস থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের দাম প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট।.
গবেষকদের হিসাবে, যুক্তিসংগত মানদণ্ডের চেয়ে প্রকল্পটির বিদ্যুতের মূল্য অন্তত ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি। একারণে ২৫ বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হতে পারে, যার মধ্যে অতিমূল্যায়নের অংশই ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।.
এনআরসিতে জমা দেওয়া হুইসেলব্লোয়ারের তথ্যে চুক্তি স্বাক্ষরে জড়িত আমলাদের কাছে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ প্রদানের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সরকারি তদন্ত চলমান রয়েছে।.
ঋণের স্থিতিশীলতা নিয়ে সতর্কবার্তা.
গবেষণায় উপসংহারে বলা হয়েছে, অতিমূল্যায়িত চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন, দুর্নীতির অভিযোগে লক্ষ্যভিত্তিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া জোরদার না করা হলে—ধীরে ধীরে আর্থিক সমন্বয়ের পরিবর্তে—ব্যয়বহুল অবকাঠামোর দায় একসময় আকস্মিক ঋণসংকট সৃষ্টি করতে পারে।. .
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: