এসএমই খাতে নিজেদের পরিধি বাড়িয়ে দেশের শীর্ষ ১৫ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান করে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে নতুন প্রজন্মের মেঘনা ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মিজানুর রহমান সম্প্রতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এএসএম সাদ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই লক্ষ্যের কথা জানান। তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে ব্যাংকটির। খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশে পৌঁছানোতে ব্যাংকিং খাতে যখন গভীর সংকট বিরাজ করছে, তখন মেঘনা ব্যাংক তাদের খেলাপি ঋণের হার এক অঙ্কের ঘরে রাখতে পেরেছে। মিজানুর রহমান মনে করেন, এটি আমানতকারীদের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।.
মেঘনা ব্যাংক কী ধরনের ব্যাংকিং করে ? .
মেঘনা ব্যাংক ছোট ঋণে ফোকাস করছে। এসএমই ব্যাংকিংয়ে ফোকাস করা হচ্ছে; যেখানে ছোট ছোট ঋণের চাহিদা থাকবে সেখানে অর্থ বিতরণ করা যাবে। তাতে স্বল্প পরিসরে যেসব ব্যবসায়ীদের ঋণের দরকার পড়বে তারা এখান থেকে উপকৃত হবেন। বর্তমানে এ ধরনের ছোট ছোট ঋণের অনেক চাহিদা রয়েছে। ছোট পর্যায় কী ধরণের ঋনের চাহিদা থাকে, সেটা নিয়ে কাজ করছে মেঘনা ব্যাংক। .
এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে ব্যাংকটি। বর্তমানে মেঘনা ব্যাংকের ৮০ শতাংশ পোর্টফোলিও কর্পোরেট ব্যাংকিং; তবে চাহিদা মোতাবেক রিটেইল, এসএমই ও ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও পোর্টফোলিও বাড়ানো হচ্ছে।.
মেঘনা ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছে কেন?.
দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক কর্পোরেট ঋণে ফোকাসড। কারণ যত বড় বড় ঋণ দেওয়া যায়, মুনাফা তত বেশি—ব্যাংক খাতে এমন একটা ধারণা আছে। তবে বড় বড় ঋণ বিতরণ করলে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। ব্যাংকিং খাত পর্যালোচনা করলে বর্তমানে কর্পোরেট ব্যাংকিং অনেক ভালনারেবল। অনেক ব্যাংক কর্পোরেট ব্যাংকিংয়ে ফোকাস করতে গিয়ে নিজেদের ঝুঁকি অনেক বেশি বাড়িয়ে ফেলেছে। দেশের ব্যাংকগুলো যদি শুরু থেকে এসএমই, রিটেইল ব্যাংকিং ও কর্পোরেটে সমানভাবে ফোকাস করত, তাহলে এ খাতের চিত্র ভিন্ন হতে পারত। .
এজন্য আমরা মনে করি, প্রত্যেকটি ব্যাংকের একটি জায়গায় আবদ্ধ না থেকে ব্যাংকের ব্যবসায় এক ধরনের বৈচিত্র্য আনা দরকার। আর যেসব ব্যাংক ব্যাংকিং ব্যবসায় যত বেশি বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে সক্ষম হবে, তত বেশি টেকসই হবে। তাই গ্রাহকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে মেঘনা ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিংয়ে জোর দিচ্ছে। ঝুঁকি ও ব্যবসার ধরন পর্যালোচনা করে মেঘনা ব্যাংক রিটেইল ব্যাংকিংয়ে আরো বেশি বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে চাচ্ছে। .
আমানতকারীরা মেঘনা ব্যাংকে টাকা রাখতে কেন আস্থা পাবেন? .
দেশের শীর্ষ যেসব ব্যাংক রয়েছে, তাদের যাত্রা অনেকদিনের। প্রথম প্রজন্মের যেসব ব্যাংক রয়েছে, তাদের বয়স ৪০ বছরের থেকেও বেশি। সেখানে মেঘনা ব্যাংক চলতি বছরে তার যাত্রার ১৩ বছর উদযাপন করতে যাচ্ছে। বড় ও প্রতিষ্ঠিত যেসব কোম্পানি রয়েছে, তারা কোনো ব্যাংকে আমানত রাখতে গেলে সেই ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে। ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সেই ব্যাংকে আমানত রাখে। কারণ আমানতই একটি ব্যাংকের প্রাণশক্তি। .
.
মেঘনা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ভিত শক্তিশালি রয়েছে, কারণ এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ শতাংশের নিচে। এজন্য বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান মেঘনা ব্যাংকের সার্বিক আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে এখানে আমানত রাখছে। আমরা আশা করছি গ্রাহকরা ব্যাংকের শক্তিশালী আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে এখানে আমানত রাখবেন। কারণ মেঘনা ব্যাংকের এডিআর রেশিও, মূলধন পর্যাপ্ততা ও খেলাপি ঋণের হার—এসব সূচক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। .
ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? .
ভবিষ্যৎ ব্যাংকিং যেহেতু ক্রমেই ডিজিটাল-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, তাই মেঘনা ব্যাংক এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ডিজিটাল ব্যাংক গঠন করতে অনেক বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। ওয়েব-ভিত্তিক ব্যাংকিং, কর্পোরেট ব্যাংকিং, রিটেইল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (মেঘনা পে)— এ চার প্ল্যাটফর্মকে একসঙ্গে করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাতে গ্রাহকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সহজে লেনদেন করতে পারবেন। .
এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে গ্রাহকরা ঘরে বসেই ঋণ সুবিধা পাবেন, যা অনেক দেশেই এখন সহজলভ্য। আমরা মনে করি, মেঘনা ব্যাংক আগামীতে ১৫টি শীর্ষ ব্যাংকের তালিকায় পৌঁছাতে পারবে। সেটা মুনাফার দিক বিবেচনা করে নয়, ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের দিক থেকে।.
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে? .
রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ব্যাংকের আসা উচিত নয়। তাই যেসব ব্যাংক চলে এসেছে, এখন তাদের কাজ করতে হবে। মেঘনা ব্যাংক বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে। নির্দিষ্ট ক্রেডিট লাইন রয়েছে, সেগুলো অর্জন করলে সেটা পাওয়া যাবে। .
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে ক্রেডিট লাইন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। তাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রমাণ করা যাবে যে দেশের অবস্থা উন্নতি হচ্ছে। আশা করা যায় নির্বাচনের পর দেশের অবস্থার আরো উন্নতি হবে, আর ক্রেডিট লাইনের যে সমস্যা তা দূর হয়ে যাবে।.
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কম কেন? .
বর্তমানে ব্যাংকগুলো ভালো ও মানসম্মত ঋণগ্রহীতা পাচ্ছে না। কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিবেচনা করে ব্যবসায়ীরা এখন নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন না। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বর্তমানে বেশ কম। নতুন বিনিয়োগের অভাবে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। আশা করা যায়, নির্বাচনের পর বিনিয়োগ বাড়বে; তখন ঋণ বিতরণও বেড়ে যাবে। .
বর্তমানে অনেক ব্যাংকের মুনাফার বড় একটা অংশ ট্রেজারি বিল-বন্ড থেকে আসছে। এর কারণ হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা নেই। তাই এসব ব্যাংক ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করছে। আশা করছি নির্বাচনের পর ঋণের চাহিদা বাড়বে।.
খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য পুনঃতফসিলের সুবিধা দিলে বাজারে কোন প্রভাব পড়ে? .
দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও অনেকে আর ফেরত দেননি। কারণ এদের মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী অর্থ নিয়ে দেশের বাইরে পাচার করেছেন। যে ব্যবসার কথা বলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে সেটা কাজেই লাগাননি। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে ১০ বছরের সুবিধা দেওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। .
তবে কিছু কিছু ব্যবসা রয়েছে যারা ডলারের কারণে আসলেই লোকসানের মুখে পড়েছে। তাদের কিন্তু আসলেই সাহায্য দেওয়া প্রয়োজন। . .
Ajker Bogura / Desk report
আপনার মতামত লিখুন: