বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), যৌক্তিকভাবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ, এপিআই শিল্পের বিকাশ এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা।জটিল লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, আমদানিনির্ভর চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং একটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) বা কাঁচামাল উৎপাদনে পিছিয়ে থাকাসহ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত। এলডিসি থেকে উত্তরণ–পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে এসব সমস্যা সমাধান এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), যৌক্তিকভাবে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ, এপিআই শিল্পের বিকাশ এবং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা।রোববার (২৫ নভেম্বর) এফবিসিসিআই আয়োজিত 'দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন।জেএমআই গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে ব্যবহৃত ওষুধের ৯৯ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও নীতিগত সহায়তার অভাবে চিকিৎসা সরঞ্জামের স্থানীয় উৎপাদন এখনও মাত্র ৫–১০ শতাংশেই সীমাবদ্ধ।তিনি বলেন, "চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে কখনো নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়নি। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প যদি নীতিগত সমর্থন না পেত, তবে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না।"তিনি সতর্ক করে বলেন, ডলারের দর ৮৭ টাকা থেকে ১২৩ টাকায় ওঠা এবং কাঁচামালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় খরচ আরও বৃদ্ধি পেতে থাকবে।বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাহী মেজর জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খরচ বাড়লেও সময়মতো ওষুধের দাম সমন্বয় না হওয়ায় অনেক কোম্পানি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারছে না।তিনি বলেন, "দেড় বছর ধরে নতুন কোনো দাম অনুমোদন করা হয়নি। কেউ দাম সমন্বয়ের চেষ্টা করলে তা ঝুলে থাকে। ইতোমধ্যে ১৩–১৪টি কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে।"তিনি আরও বলেন, আমদানি-নির্ভরতা বড় ঝুঁকি হয়ে আছে, একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল (এপিআই) উৎপাদনের অনুমোদনের জন্য কখনো কখনো ৪৭টি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়—যা উৎপাদন বিলম্বিত করে ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।তিনি বলেন, এপিআই উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ করা হলেও গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে এপিআই পার্ক এখনো পুরোপুরি কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না।তিনি আরও বলেন, "দক্ষ জনবল নেই, আর একাডেমিয়া–ইন্ডাস্ট্রির সহযোগিতাও অনুপস্থিত। সংশোধিত কারিকুলাম ইউজিসিতে জমা দেওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।"বক্তারা জানান, লাইসেন্সিং জটিলতা পুরো খাতকে পঙ্গু করে রেখেছে। নারকোটিক্স লাইসেন্স পেতে ১৫ দিন থেকে এক মাস—কখনো আরও বেশি সময় লাগে। শুধু লাইসেন্সের কাগজপত্র দেখভালের জন্যই কোম্পানিগুলোকে আলাদা জনবল নিয়োগ করতে হচ্ছে। পরিবেশ-সংক্রান্ত ছাড়পত্রের জন্য ২০টিরও বেশি নথি জমা দিতে হয়, ফলে মাসের পর মাস দেরি হয়। অনেক কোম্পানি আবার যথাযথ লাইসেন্স ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে—যা মনিটরিংয়ের দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে।ব্র্যাকের সিনিয়র ডিরেক্টর ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, নিম্ন–আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া দ্রুত সংস্কার করতে হবে।ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, একটি নতুন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির ব্রেক–ইভেনে পৌঁছাতে সাধারণত পাঁচ বছর লাগে। তাই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের আগে সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা জরুরি।তিনি আরও বলেন, "আমরা কোনো কাজ ঝুলিয়ে রাখি না। অনেকেই ভেজাল বা নকল ওষুধের অভিযোগ করেন, কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেন না।"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়েদ আব্দুল হামিদের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের চিকিৎসা সরঞ্জাম বাজারের আকার এখন প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদকরা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছেন।এখানে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো—কাঁচামালের ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয়; অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামালের ওপর শুল্ক প্রস্তুত তৈরি পণ্যের শুল্কের চেয়েও বেশি– যেমন ব্যুরেট ইনফিউশন সেটের কাঁচামালের ওপর ২৫০ শতাংশ শুল্ক, কিন্তু প্রস্তুত পণ্যের ওপর মাত্র ১০ শতাংশ; নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় সস্তা ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি অননুমোদিতভাবে দেশে ঢুকে বাজার অস্থিতিশীল করছে।তিনি ১০–১৫ বছরের ভ্যাট অব্যাহতি, শুল্ক কাঠামোর সংশোধন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি সীমিতকরণ এবং অননুমোদিত পণ্য ঠেকাতে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন।তার মতে, ৪ বিলিয়ন ডলারের বাংলাদেশি ওষুধ বাজার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে—কারণ এপিআই উৎপাদনের বদলে আমদানির ওপরই নির্ভরতা বেশি।তিনি বলেন, "আমরা ২০১৮ সালে এপিআই নীতি করেছি। চীন ও ভারত এপিআই উন্নয়নে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছে—আমাদেরও একইভাবে এগোতে হবে।" নিজস্ব এপিআই সক্ষমতা এবং শক্তিশালী একাডেমিয়া–ইন্ডাস্ট্রি সহযোগিতা ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণ–পরবর্তী ঝুঁকি মোকাবিলা কঠিন হবে বলে জানান তিনি।বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গবেষণা ও নীতি অনুষদের মহাপরিচালক গাজী একেএম ফজলুল হক বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের জন্য নীতি প্রণয়নে বিডা উদ্যোগ নিয়েছে। খসড়া নীতি তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।তিনি আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণ–পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে এপিআই উৎপাদন, নতুন পণ্যের নিবন্ধন এবং গবেষণায় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান স্বীকার করেন, জটিল লাইসেন্স প্রক্রিয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ আওতার বাইরে থেকে গেছে।তিনি বলেন, "আমরা নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করে তিন বছরের চক্রে আনার চেষ্টা করব, তবে মানের সঙ্গে কোনো আপস হবে না।"তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশে ডায়াগনস্টিক সেবা, নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ জনবল এবং জরুরি চিকিৎসা সেবায় গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। এসব কাঠামোগত ঘাটতি পূরণে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় পরিবারগুলোকে দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর্থিক সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবীমাকে তিনি অত্যন্ত জরুরি হিসেবে উল্লেখ করেন।.
Ajker Bogura / suhani Alam
আপনার মতামত লিখুন: