দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়ন না পাওয়া বহু নেতার সঙ্গে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি কথা বলে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ওপরও পৃথকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর বিভিন্ন জেলায় মনোনয়ন–সংক্রান্ত যে বিরোধ দেখা দিয়েছে, তার কারণ খতিয়ে দেখতে কাজ করছে বিএনপির একটি টিম।তারা প্রার্থীদের দুর্বলতা যাচাই করছে এবং মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। জানা গেছে, এই টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রার্থী তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে।দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়ন না পাওয়া বহু নেতার সঙ্গে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি কথা বলে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করছেন তারেক রহমান। পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের ওপরও পৃথকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিরোধপূর্ণ প্রতিটি আসনের সব পক্ষকে ঢাকায় ডেকে কথা বলছেন। ইতোমধ্যে গুলশান কার্যালয়ে একাধিক জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। গুলশান কার্যালয়ের বাইরেও সুবিধাজনক স্থানে মনোনয়নবঞ্চিতদের ডেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তারা।সূত্র জানায়, বৈঠকে মনোনয়নবঞ্চিতদের দলীয় ঐক্য ধরে রাখা, দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলা এবং দলের নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জনভোগান্তি সৃষ্টি হয় বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কর্মসূচি থেকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রার্থীদের নিয়ে অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে জমা দিতে বলা হয়েছে। সব পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি।ইতোমধ্যে তারেক রহমানের নির্দেশে জয়পুরহাট, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের কয়েকটি আসনের মনোনয়নবঞ্চিতদের ডেকে কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব। পর্যায়ক্রমে বিরোধপূর্ণ সব আসনের মনোনয়নবঞ্চিতদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে।এদিকে, মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ ও প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ, মিছিল, প্রতিবাদ, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ করছেন মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা ও তাদের সমর্থকরা। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছেও অনেকে লিখিত অভিযোগ জমা দিচ্ছেন।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫০টির বেশি আসনে মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এতে নেতা–কর্মীদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়েছে। মনোনয়নবঞ্চিতদের কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারা প্রয়োজনে নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে নতুন করে জরিপ বা তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ জানিয়েছেন।বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন মনোনয়নবঞ্চিত নেতা জানান, প্রার্থিতা পুনর্বিবেচনা না করলে বিজয় কঠিন হবে। তাই নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে নতুন করে জরিপ বা তথ্য সংগ্রহের অনুরোধ করেছেন তারা। একইসঙ্গে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।গত সোমবার রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মনোনয়ন–সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে কিছু সদস্য বলেন, বড় দলে কিছু আসনে বিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। অধিকাংশ আসনেই ঘোষিত প্রার্থীরা এলাকায় গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয়। তবে কয়েকটি আসন পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও মত দেন তারা।গত ৩ নভেম্বর বিএনপি ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে। পরদিন একজনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে অর্ধশতাধিক আসনে অসন্তোষের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে দলটির একটি সূত্র বলছে, ২০–২৫টি আসনে সংকট তীব্র আকার নিয়েছে, যার মধ্যে ১০ থেকে ১৫টি আসনে পরিস্থিতি গুরুতর। ইতোমধ্যে কয়েকটি আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা করছে বিএনপি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর চূড়ান্ত মনোনয়নে এসব পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, প্রার্থী ঘোষণার পর কিছু আসনে বিভেদ দেখা দিয়েছিল। বড় দলে মনোনয়ন ঘিরে বিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। আশা করি, এসব বিরোধ মিটে যাবে। তিনি বলেন, "অনেক জায়গায় মনোনয়নবঞ্চিতদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষোভ নিরসনের চেষ্টা করছি। তবে তফসিল ঘোষণার পরও যারা দলীয় সিদ্ধান্ত মানবেন না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"ঢাকা–১৪ আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন সানজিদা ইসলাম তুলি। প্রার্থিতা পুনর্বিবেচনার দাবি তুলছেন এস এ সিদ্দিক সাজুর সমর্থকরা। সাজুর মনোনয়ন দাবিতে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের ১২৬ জন পদধারী নেতা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন। এ দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচিও পালন করছে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ। দলের নীতি–আদর্শ পরিপন্থী কর্মকাণ্ড ও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যের অভিযোগে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক সাজুকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে।নারায়ণগঞ্জ–৩ আসনে প্রাথমিকভাবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আজহারুল ইসলাম মান্নান। এ আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে বিএনপিতে চিঠি দিয়েছেন অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তাদের চিঠিতে বলা হয়েছে, আজহারুল ইসলাম মান্নানকে নিয়ে নির্বাচন করলে কোনো অবস্থাতেই বিজয় অর্জন সম্ভব হবে না। দলের বৃহত্তর স্বার্থে তারা যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেছেন।এছাড়া আরও কয়েকটি আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে স্থানীয় নেতারা বিএনপিতে চিঠি দিয়েছেন। এসব আসনের মধ্যে রয়েছে—সিলেট–৬, গোলাপগঞ্জ–২; চট্টগ্রাম–১; যশোর–১ ও ২; চট্টগ্রাম–১, ১২ ও ১৩; সাতক্ষীরা–২।আরও বেশ কিছু আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করেছে বিএনপির একাংশ। এসব আসন হলো—মাগুরা–২; গাইবান্ধা–৪; নরসিংদী–৪; টাঙ্গাইল–১ ও ৫; ঝিনাইদাহ–৩; নাটোর–১; চাঁপাইনবাবগঞ্জ–২; ময়মনসিংহ–৩, ৬ ও ৯; নীলফামারী–৪; কুষ্টিয়া–২, ৩ ও ৪; কিশোরগঞ্জ–৫; চট্টগ্রাম–২, ৪ ও ১৬; কুমিল্লা–৫, ৬ ও ১০; জামালপুর–২; সাতক্ষীরা–৩; কুড়িগ্রাম–১ ও ৩; রাজশাহী–১, ৩ ও ৪; ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৫; নোয়াখালী–২ ও ৫; ফেনী–২; শেরপুর–১ ও ২; চাঁদপুর–৪; মেহেরপুর–১, ২ ও ৩; নওগাঁ–১, ৩ ও ৪; জয়পুরহাট–২; পাবনা–৪; মুন্সিগঞ্জ–১; দিনাজপুর–২; মৌলভীবাজার–২; টাঙ্গাইল–৩; সুনামগঞ্জ–১; ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৪; কুষ্টিয়া–৪; নেত্রকোণা–৫.
Ajker Bogura / suhani Alam
আপনার মতামত লিখুন: