ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের সুবিধা নিয়ে অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী এবার নির্বাচনে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন বিজয়ী হয়েছেন, এবং সবাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে নির্বাচিত। তবে দুজনের ক্ষেত্রে—চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে—ঋণসংক্রান্ত মামলা আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি না হওয়ায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিক ফলাফল প্রকাশ করেনি। ফলে তাঁরা শপথ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণও পাননি।.
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিতে অযোগ্য। সংশোধিত বিধানে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচিত হওয়ার পর কারও ঋণখেলাপি থাকার প্রমাণ মিললে বা হলফনামায় মিথ্যা তথ্য ধরা পড়লে নির্বাচন কমিশন তাঁর সদস্যপদ বাতিল করতে পারে। অর্থাৎ, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা পর্যন্ত তাঁরা আইনি সুরক্ষা পেলেও আদেশ প্রত্যাহার হলে এমপি পদ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।.
তবে স্থগিতাদেশের মেয়াদের মধ্যে ঋণ এককালীন পরিশোধ বা পুনঃতপশিল করলে ঝুঁকি কমে আসবে। অন্যদিকে আদালত যদি স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ায় কিংবা ঋণ নিয়মিত করা যায়, তাহলে সাময়িক স্বস্তি মিলবে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলে বা পুনরায় খেলাপি হলে একই ঝুঁকি ফিরে আসবে।.
মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল ২৯ ডিসেম্বর। পরদিন বাংলাদেশ ব্যাংক–এর ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) নির্বাচন কমিশনে দুটি তালিকা পাঠায়—একটিতে ৮২ জন ঋণখেলাপি, অন্যটিতে ৩১ জন, যারা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশপ্রাপ্ত। পরবর্তী আপিল ও আদালতের আদেশে ৮২ জনের মধ্যে ১৫ জন এবং স্থগিতাদেশপ্রাপ্তদের প্রায় সবাই প্রার্থিতা ফিরে পান। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দসহ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়।.
সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও আইন পরিবর্তন না হওয়ায় স্থগিতাদেশপ্রাপ্তদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঠেকানো যায়নি। নির্বাচন কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বলেছেন, আইনের বাধ্যবাধকতার কারণেই তাঁদের সুযোগ দিতে হয়েছে।.
চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের দুই বিজয়ীর ফল আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ঝুলে আছে। অন্য কয়েকজনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিতাদেশ রয়েছে—যার মেয়াদ ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে শেষ হবে। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ নিয়মিত না হলে তাঁদের সাংসদ পদ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।.
এ ছাড়া নির্বাচিতদের বাইরে আরও কয়েকজন প্রার্থী পুনঃতপশিল বা পরিশোধের মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে খেলাপিমুক্ত হয়ে মনোনয়ন বৈধ করেন। আবার একজন প্রার্থী আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান ঋণ শোধের পর।.
সুশাসনকর্মীরা বলছেন, আদালতের স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে অযোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্ট করে। তাঁদের মতে, এতে জয়-পরাজয়ের সমীকরণও বদলে যেতে পারে।.
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে—নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দ্রুত ঋণ পরিশোধ বা পুনঃতপশিলের মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান করবেন। কারণ আদালতের স্থগিতাদেশ কেবল সাময়িক সুরক্ষা দেয়, স্থায়ী নিষ্পত্তি নয়।.
সব মিলিয়ে, স্থগিতাদেশের আইনি ছায়ায় নির্বাচিত ১১ এমপির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—ঋণ নিয়মিত করে ঝুঁকি কাটাবেন, নাকি আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তায় থাকবেন?. .
Ajker Bogura / Arifin
আপনার মতামত লিখুন: