ভারতের গুজরাট রাজ্যের সুরাটের সালাবাতপুরা এলাকায় ভোটার তালিকা নিয়ে বড় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। শত শত স্থানীয় বাসিন্দা থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে বলেছেন, স্থানীয় ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা কর্পোরেটর বিক্রম পোপাট পাতিল ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।.
স্থানীয়রা বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ৭ নম্বর ফরমের চরম অপব্যবহার করা হচ্ছে। অসংখ্য জীবিত ভোটারকে 'মৃত' ঘোষণা করে তাদের নাম মুছে ফেলার জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।.
অভিযোগকারী ভোটারদের সবাই-ই মুসলিম।.
এসব আবেদনপত্রে বিজেপি কর্পোরেটর বিক্রম পোপাট পাতিলের নাম ও মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে 'দ্য ওয়্যার হিন্দি' ফোনে পাতিলের সাথে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু 'এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি' বলেই তিনি ফোনকল কেটে দেন।.
এরপর থেকে তিনি আর ফোন ধরেননি। তাকে মেসেজও পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু হিন্দিতে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।.
৭ নম্বর ফরমের আবেদনগুলোতে থাকা স্বাক্ষরের সাথে পাতিলের নির্বাচনি হলফনামায় দেওয়া স্বাক্ষরের মিল রয়েছে। ২০২১ সালে সুরাট মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় তিনি ওই হলফনামা পূরণ করেছিলেন।.
অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে, তা জানতে দ্য ওয়্যার হিন্দি সালাবাতপুরা থানার ইন্সপেক্টর কে. ডি. জাদেজার সাথে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু এই পুলিশ কর্মকর্তা কোনো সাড়া দেননি।.
আনোয়ারনগর এলাকার ৬৯ বছর বয়সি বাসিন্দা আবদুল রাজ্জাক উজির শাহ এই অভিযোগকারীদের একজন। তিনি দ্য ওয়্যার হিন্দিকে বলেন, 'আমরা মুসলিম বলেই বিজেপি আমাদের টার্গেট করছে। ইচ্ছা করেই আমাদের ভোট বাতিল করা হচ্ছে।'.
যেভাবে প্রকাশ্যে এল এই জালিয়াতি.
বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার (এসআইআর) অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এ কার্যক্রমে ভোটার তালিকা থেকে ৭৩ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হলেও প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ ভোটারের খসড়া তালিকায় অভিযোগকারীদের নাম ঠিকই ছিল।.
খসড়া তালিকা প্রকাশের পর দাবি ও আপত্তি জানানোর জন্য ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সময়ের মধ্যেই বিজেপি কর্পোরেটর ৭ নম্বর ফরমের মাধ্যমে নাম বাতিলের আবেদনগুলো করেছিলেন।.
আবদুল রাজ্জাক বলেন, 'এসআইআর চলাকালীন আমরা আমাদের ভোটার হওয়ার প্রমাণ দিয়েছিলাম। খসড়া তালিকায় আমাদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে আমাদের এলাকার বিজেপি কর্পোরেটর বিক্রম পোপাট পাতিল ৭ নম্বর ফরম পূরণ করে আমাদেরকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আমরা বিএলও-র (ব্লক লেভেল অফিসার) কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারি। তিনিই আমাদেরকে ৭ নম্বর ফরমের আবেদনগুলো দেখিয়েছিলেন।' তবে সরকারি বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ করে বিএলও সালমান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। .
রাজ্জাক জানান, তার ছেলে ও স্ত্রীর নামেও ৭ নম্বর ফরম পূরণ করে তাদেরকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। এই তিনটি ফরমেই বিক্রম পোপাট পাতিলের নাম ও নম্বর দেওয়া আছে।.
সালাবাতপুরার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় খবরটি ছড়িয়ে পড়লে আরও অনেক ভোটার তাদের নামের বর্তমান অবস্থা নিয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। দ্য ওয়্যার হিন্দি এমন প্রায় ১১৮ জন ব্যক্তির নাম ও ইপিইআইসি নম্বর হাতে পেয়েছে, যাদেরকে ৭ নম্বর ফরম ব্যবহার করে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।.
যেসব ভোটারের নাম বাতিলের জন্য ৭ নম্বর ফরম জমা দেওয়া হয়েছিল, ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি তাদের এক বিশাল অংশ সালাবাতপুরা থানায় উপস্থিত হন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সবকটি ফরমই বিজেপির পাতিল পূরণ করেছেন।.
অভিযোগকারীরা এই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অভিযুক্ত বিজেপি কর্পোরেটরের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভোটার তালিকার বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও তুলেছেন।.
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা শুধু জীবিতই নন, বরং বছরের পর বছর ধরে একই ঠিকানায় বসবাস করছেন, ভোটও দিয়ে আসছেন নিয়মিত। তা সত্ত্বেও তাদেরকে 'মৃত' দেখিয়ে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।.
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেই এই পুরো ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। এর ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।.
৭ নম্বর ফরম হলো ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের কাছে জমা দেওয়ার জন্য একটি আবেদনপত্র। এটি বর্তমান ভোটার তালিকায় অন্য কোনো ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আপত্তি জানাতে অথবা নিজের নাম প্রত্যাহারের অনুরোধ করতে ব্যবহার করা হয়। .
যিনি একই নির্বাচনি এলাকা ও ভোটকেন্দ্রের নিবন্ধিত ভোটার, শুধু সেই ব্যক্তিই ৭ নম্বর ফরম পূরণ করতে পারবেন। আবেদনকারীকে অবশ্যই তার নাম, ইপিআইসি নম্বর ও আপত্তি বা অনুরোধের কারণসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ জমা দিতে হয়। এ ফরমে মিথ্যা তথ্য প্রদান শাস্তিযোগ্য অপরাধ। .
মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও গুজরাট বিজেপির মুখপাত্র অনিল প্যাটেল কোনো সাড়া দেননি। .
গুজরাটের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পুরো বিষয়টিকে 'নির্বাচনি কারচুপি' আখ্যা দিয়ে বলেছে, ভোটার তালিকায় কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।.
গুজরাট কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক আসলাম সাইকেলওয়ালা বলেন, 'সুনির্দিষ্টভাবে মুসলিমদেরই টার্গেট করা হচ্ছে। তাদের নাগরিকত্ব ও সাংবিধানিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।. .
Ajker Bogura / Md Shourov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: