• ঢাকা
  • বুধবার, ২৮ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ১১ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

তেল, শুল্ক আর কৃষি: যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্য চুক্তির যেসব বিষয় এখনো অজানা


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ ফেরুয়ারী, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১১:০৪ এএম
তেল, শুল্ক আর কৃষি: যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্য চুক্তির যেসব বিষয় এখনো অজানা

গত সপ্তাহে দুই দেশ অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেয়। সেই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনে।.

 .

শুক্রবার ভারত–যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের পর দেশটিতে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ভারতের বিরোধী দল, কৃষক সংগঠন এবং বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা চুক্তির শর্ত ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন।.

এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য কিনবে। তবে এতে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার কোনো প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়নি।.

এর আগে, গত সপ্তাহে দুই দেশ অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেয়। সেই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনে। চূড়ান্ত আলোচনা এখনো চলমান থাকলেও, এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি ঘিরে চারটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে।.

ভারত কি বেশি দিচ্ছে?.

চুক্তি অনুযায়ী, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পপণ্য এবং বেশ কিছু খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে 'পারস্পরিক শুল্ক' ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামাবে।.

দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) এই ব্যবস্থাকে 'অসম বিনিময়' বলে অভিহিত করেছে। ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমসহ বিরোধী নেতারা বলেছেন, চুক্তির কাঠামোটি 'পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে' এবং এতে অসমতা স্পষ্ট।.

তবে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল চুক্তির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তার মতে, ১৮ শতাংশ শুল্কহার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। এতে ভারতের টেক্সটাইল, চামড়া ও রত্নপাথরের মতো শ্রমঘন খাত উপকৃত হবে। বেশির ভাগ শিল্প সংস্থাও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছে।.

রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ হবে কি?.

রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের বিষয়ে ভারতের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। গত সপ্তাহে চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভারত এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনো কথা নেই।.

একটি পৃথক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প বলেন, ভারত 'প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে' রাশিয়ার তেল কেনা পুনরায় শুরু করে কি না, তা যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষণ করবে। এর ওপর ভিত্তি করেই ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক পুনরায় আরোপ করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।.

এ বিষয়ে এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গোয়েল বলেন, তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় 'স্বতন্ত্র কোম্পানিগুলো'। তার মতে, বাণিজ্য চুক্তি 'কে কোথা থেকে কী কিনবে, তা নির্ধারণ করে না'।.

রাশিয়া জানিয়েছে, ভারত সরবরাহ বন্ধ করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত তারা পায়নি। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভারতীয় রিফাইনারিগুলো নতুন করে রাশিয়ার তেল কেনা এড়িয়ে চললেও, আগেই নির্ধারিত কিছু চালান এখনো আসার কথা রয়েছে।.

এ বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বিবৃতি না আসায় বিরোধীরা অভিযোগ করছে, সংসদে স্বচ্ছতা ছাড়াই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।.

কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেলানি 'এক্স'-এ লিখেছেন, 'শুধুমাত্র রাশিয়া থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আমদানি বন্ধের শর্তে ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে ওয়াশিংটন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে সংকুচিত করতে বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।'.

কৃষকেরা কি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন?.

এই চুক্তি নিয়ে ভারতের কৃষক ইউনিয়নগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, মার্কিন কৃষিপণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হলে দেশীয় উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।.

২০২০ ও ২০২১ সালে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা জানিয়েছে, ড্রাইড ডিস্টিলার্স গ্রেইনস, সয়াবিন তেল, লাল জোয়ার, বাদাম ও ফল অবাধে আমদানির সুযোগ পেলে কৃষকদের আয় কমে যাবে।.

কিষাণ মোর্চা বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে এবং আন্দোলন জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে।.

গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) বলছে, চুক্তিতে শুল্ক হ্রাসের জন্য অন্তর্ভুক্ত 'অতিরিক্ত কৃষিপণ্য' কী কী, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার ধারণা নেই।.

ব্রোকারেজ হাউস সিস্টেমেটিক্স রিসার্চ এক নোটে জানিয়েছে, কৃষি ও খাদ্যপণ্যকে শুল্ক কমানোর তালিকায় রাখলে 'অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া' দেখা দিতে পারে। কৃষক সংগঠনগুলো ভুট্টা, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য ও বাদামের দাম কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে।.

গোয়েল জানিয়েছেন, দুগ্ধজাত পণ্য, জিনগতভাবে পরিবর্তিত (জিএম) পণ্য, মাংস কিংবা পোলট্রির ক্ষেত্রে ভারত কোনো ছাড় দেয়নি। তার দাবি, কৃষকদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, রপ্তানির সুযোগ বাড়ার ফলে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত কৃষকদেরই উপকারে আসবে।.

৫০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?.

চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে ভারত জ্বালানি, বিমান, প্রযুক্তিপণ্য ও কোকিং কয়লাসহ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নযোগ্য কি না।.

জিটিআরআইয়ের হিসাবে, এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের বার্ষিক আমদানি প্রতি বছর দ্বিগুণেরও বেশি বাড়াতে হবে। তাছাড়া বিষয়টি অনেকাংশেই বেসরকারি খাতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল, যা সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই।.

সিস্টেমেটিক্স রিসার্চ সতর্ক করে বলেছে, এই প্রতিশ্রুতি ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা বাণিজ্য উদ্বৃত্ত কমিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।.

তবে গোয়েল এই লক্ষ্যমাত্রাকে 'অত্যন্ত রক্ষণশীল' বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বিমান, জ্বালানি ও ডেটা সেন্টার সরঞ্জামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তিনি বলেন, ভারতের কাছে ইতিমধ্যেই হাজার কোটি ডলারের বিমানের অর্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলে সামগ্রিক আমদানিও বাড়বে।.

এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর না মিললেও, চুক্তির ঘোষণার পর ভারতের শেয়ারবাজার চাঙা হয়েছে। শুল্ক হ্রাস, জ্বালানি সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক দেশের প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এমন প্রত্যাশাই করা হচ্ছে।.

.

Ajker Bogura / Md.Showrov Hossain

আর্ন্তজাতিক বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ