গত ২৬ জানুয়ারি উত্তরাখণ্ডে ওয়াকিল আহমেদ (৭০) নামের এক বৃদ্ধের দোকানে গিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের কয়েকজন সদস্য দোকানের নাম পরিবর্তনের দাবি তোলে। বিষয়টি দেখে প্রতিবাদ করেন দীপক কুমার ও বিজয় রাওয়াত নামের দুই স্থানীয় বাসিন্দা।.
ভারতের উত্তরাখণ্ডে হিন্দুত্ববাদীদের হাত থেকে এক বৃদ্ধ মুসলিম দোকানিকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন দুই তরুণ। কিন্তু উল্টো ওই দুজনকেই অভিযুক্ত করে মামলা করেছে পুলিশ। .
গত ২৬ জানুয়ারি উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বার এলাকায় ওয়াকিল আহমেদ (৭০) নামের এক বৃদ্ধকে হেনস্তা করছিল একদল লোক। তার দোকানের নাম 'বাবা স্কুল ড্রেস'—এটাই ছিল তাদের আপত্তির কারণ। ওয়াকিলের দোকানে গিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের কয়েকজন সদস্য দোকানের নাম পরিবর্তনের দাবি তোলে। .
বিষয়টি দেখে প্রতিবাদ করেন দীপক কুমার ও বিজয় রাওয়াত নামের দুই স্থানীয় বাসিন্দা।.
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, দীপক ওই দলটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছেন। বিক্ষোভকারীরা তার নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'আমার নাম মোহাম্মদ দীপক।'.
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপকের এই সাহসিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বেশ প্রশংসিত হয়। তবে বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো।.
গত ৩১ জানুয়ারি ৪০ জনের বেশি লোক জড়ো হয়ে দীপকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। পুলিশ 'দ্য হিন্দু'কে জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করেছিল। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।.
দীপক জানান, তার বাড়ির সামনে যখন বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছিল, তখন ঘরে তার মা, স্ত্রী ও পাঁচ বছরের মেয়ে একা ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি নিজের জীবন নিয়ে ভয়ে আছি।' .
.
পৌরি গাড়ওয়ালের পুলিশ সুপার সর্বেশ পানওয়ার জানান, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দলের দুই সদস্য গৌরব কাশ্যপ ও কমল পালের অভিযোগের ভিত্তিতে দীপক কুমার ও বিজয় রাওয়াতের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি দেখানো, আঘাত করা, দাঙ্গা বাধানো ও শান্তি ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।.
পুলিশ সুপার বলেন, অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে যে ওই দুই যুবক অভিযোগকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন। এমনকি টাকা, ঘড়ি ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের গালিগালাজও করেছেন। .
ভিএইচপি ও বজরং দলের সদস্যদের দাবি, তারা দীপক ও বিজয়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়তে বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়েছিলেন। তখনই নাকি এ ঘটনা ঘটে।.
তবে ঘটনার জেরে আরও দুটি মামলা হয়েছে। দীপক ও বিজয়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে রাস্তা অবরোধ করায় অজ্ঞাতনামা কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে পুলিশ একটি মামলা করেছে।.
অন্য মামলাটি করেছেন ভুক্তভোগী দোকানি ওয়াকিল আহমেদ। দোকানে অনধিকার প্রবেশ, অপমান ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে দুজনকে নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে এ মামলায়। গত ৩১ জানুয়ারি রাতে এই তিনটি মামলাই নথিভুক্ত করা হয়।.
এদিকে কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে দীপককে 'হিরো' হিসেবে অভিহিত করে লিখেছেন, 'দীপক সংবিধান ও মানবতার জন্য লড়ছেন। বিজেপি ও সংঘ পরিবার প্রতিদিন এই সংবিধানকেই পদদলিত করার ষড়যন্ত্র করছে। ঘৃণার বাজারে দীপক ভালোবাসার দোকানের এক জীবন্ত প্রতীক। আর এটাই ক্ষমতায় থাকা লোকজনের সবচেয়ে বেশি গায়ে লাগে।'.
পোস্টে তিনি আরও বলেন, 'সংঘ পরিবার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বিষ ছড়াচ্ছে, যাতে ভারত বিভক্ত থাকে এবং ভয়ের ওপর ভর করে গুটিকয় মানুষ শাসন চালিয়ে যেতে পারে। উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার প্রকাশ্যে ওই সব অসামাজিক শক্তির পক্ষ নিচ্ছে, যারা সাধারণ নাগরিকদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে ও হেনস্তা করছে।'.
রাহুল গান্ধী বলেন, 'ঘৃণা, ভয় ও অরাজকতার পরিবেশে কোনো দেশ এগোতে পারে না। শান্তি ছাড়া উন্নয়ন কেবল ফাঁকা বুলি। আমাদের আরও অনেক দীপকের প্রয়োজন—যারা মাথা নত করে না, ভয় পায় না এবং সর্বশক্তি দিয়ে সংবিধানের পাশে দাঁড়ায়।'.
দীপককে সাহস জুগিয়ে রাহুল লেখেন, 'ভাই, আমরা তোমার সঙ্গে আছি। ভয় পেও না।' . .
Ajker Bogura / Md.Showrov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: