ওজেমপিক’-এর মূল উপাদান হলো ‘সেমাগ্লুটাইড'। আগামী মার্চ মাসে ভারতে এই সেমাগ্লুটাইড তৈরির প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই তারা এই ওষুধের সাস্রয়ী সংস্করণ বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।.
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে প্রতিদিন সকালে এক অদ্ভুত দৃশ্যের দেখা মেলে। কেউ হয়তো ফিটনেস ঘড়ি হাতে দৌড়াচ্ছেন, আবার কেউ কিছুক্ষণ পরেই পাশের খাবারের দোকানে গরম গরম শিঙারা আর সাথে রসে ভেজানো জিলাপিতে কামড় দিচ্ছেন। .
একদিকে ভারতের মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা আর অন্যদিকে মুখরোচক খাবারপ্রীতির এই অদ্ভুত দ্বিধাময় সম্পর্কই এখন বড় এক বাণিজ্যিক পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করছে।.
এই পটভূমির মুূল কেন্দ্র ওজন কমানোর এক জাদুকরী ওষুধ। ডেনমার্কের কোম্পানি নভো নরডিস্কের বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ইনজেকশন 'ওজেমপিক'-এর মূল উপাদান হলো 'সেমাগ্লুটাইড'। এটি মূলত এক ধরনের প্রোটিন, যা মস্তিষ্ককে বার্তা দেয় যে আপনার ক্ষুধা নেই।.
আগামী মার্চ মাসে ভারতে এই সেমাগ্লুটাইড তৈরির প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।.
এই সুযোগেরই অপেক্ষায় আছে ভারতের বিশাল ওষুধ শিল্প। প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই তারা এই ওষুধের সাস্রয়ী সংস্করণ বা জেনেরিক ওষুধ বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে ওজন কমানোর এই ওষুধের দাম প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিনিয়োগকারী ব্যাংক জেফরিসের ধারণা, ভবিষ্যতে ভারতে এই ওষুধের বাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে।.
ভারতের সরকারি সংস্থা ফার্মাসিউটিক্যালস এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার (ফার্মেক্সিল) চেয়ারম্যান নমিত জোশি বলেন, 'আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই বাজারে এই ওষুধ আসবে।'.
কয়েক দশক আগে মরণঘাতী এইচআইভির ওষুধ সস্তায় তৈরি করে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল ভারত। এ কারণেই দেশটিকে বলা হয় 'গোটা বিশ্বের ওষুধের দোকান'। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থূলতা বা মেদ কমানোর লড়াইয়েও ভারত এবার বিশ্বের প্রধান সস্তা জোগানদাতা হয়ে উঠতে পারে।.
ভারতের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বর্তমানে ভারতকে বিশ্বের 'ডায়াবেটিস রাজধানী' বলা হয়। পাশাপাশি এখানে স্থূলতার হারও দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসা সাময়িকী 'দ্য ল্যানসেট'-এর তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতে অতিরিক্ত ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৫ কোটিতে। .
পেট ভরা থাকার সংকেত দেবে এই 'ম্যাজিক পিল'.
সেমাগ্লুটাইড আসলে কীভাবে কাজ করে? এটি মূলত মানবদেহের এমন একটি হরমোনের কাজ করে যা ক্ষুধা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। সহজ কথায়, এটি আপনার মস্তিষ্ককে এই সংকেত দেয় যে আপনার পেট ভরা আছে। .
মেদ কমানোর জনপ্রিয় ওষুধ 'ওজেমপিক'-এর মূল উপাদান এটি। ওজেমপিক সাধারণত ইনজেকশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা রোগীরা নিজেরাই শরীরে পুশ করতে পারেন।.
আগামী মার্চে প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারতের বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো এই ইনজেকশন হুবহু তৈরি করতে পারবে বলে নিশ্চিত। ডক্টর রেড্ডিস ল্যাবরেটরিজ, সিপলা এবং ওয়ানসোর্স স্পেশালিটি ফার্মাসহ ভারতের অন্তত ১০টি বড় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে এই ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে।.
এর মধ্যে ওয়ানসোর্স জানিয়েছে, তারা তাদের উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচ গুণ বাড়াতে প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে তারা বিপুল পরিমাণে এই ইনজেকশন বাজারে ছাড়ার লক্ষ্য নিয়েছে। বিশেষ করে সেমাগ্লুটাইড ভরা সিরিঞ্জ তৈরির ওপর তারা সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই এটি ব্যবহার করতে পারেন।.
বিশ্ববাজারেও দাপট দেখাবে ভারতীয় ইনজেকশন.
মেদ কমানোর ওষুধের লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই ভারতের আরেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান 'বায়োকন'। তারা বেঙ্গালুরুতে প্রায় ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগে ইনজেকশন তৈরির একটি বিশাল কারখানা স্থাপন করেছে। .
বায়োকনের প্রধান নির্বাহী সিদ্ধার্থ মিত্তাল জানান, ২০২৭ সাল নাগাদ তারা এই ওষুধ বাজারে আনার লক্ষ্য নিয়েছেন। ভারতের পাশাপাশি ব্রাজিল ও কানাডার বাজারেও এটি রপ্তানি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।.
অন্যদিকে, ডক্টর রেড্ডিস ল্যাবরেটরিজ জানিয়েছে, তারা আগামী বছরই ভারতসহ বিশ্বের ৮৭টি দেশে এই ওষুধের জেনেরিক বা সস্তা সংস্করণ বাজারজাত করার পরিকল্পনা করছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী এরেজ ইসরায়েলি আশা করছেন, এই জেনেরিক ওষুধ থেকে তাদের কয়েকশ কোটি ডলার আয় হবে।.
বর্তমানে ওজন কমানোর এই ওষুধের পেছনে মাসে যে বিপুল টাকা খরচ করতে হয়, তা নাটকীয়ভাবে কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফার্মেক্সিলের চেয়ারম্যান নমিত জোশির মতে, প্যাটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যে ভারতে এই ওষুধের মাসিক খরচ নেমে আসবে ৭৭ ডলারে। সময়ের ব্যবধানে এটি আরও কমে মাত্র ৪০ ডলারে দাঁড়াতে পারে।.
তবে ভারতের এই 'সস্তা বিপ্লবের' সুফল এখনই পাবেন না যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা। কারণ আমেরিকায় ওজেমপিকের প্যাটেন্টের মেয়াদ ২০৩০ সালের আগে শেষ হবে না। ফলে সেখানে ওষুধের চড়া দাম আরও বেশ কয়েক বছর বজায় থাকবে।.
মেদ কমানোর ইনজেকশনে পেলেন নতুন জীবন .
মুম্বাইয়ের ৭০ বছর বয়সী হিসাবরক্ষক মহেশ চামাদিয়া একসময় প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। ভাবতেন, এই বয়সে আর বোধ হয় ওজন কমানো সম্ভব নয়। অথচ চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না তার। .
প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটায় উঠে ব্যাডমিন্টন খেলা, বাড়িতে ট্রেডমিল চালানো কিংবা নিয়মিত যোগব্যায়াম ও ডায়েট—সবই করেছেন তিনি। কিন্তু লাভ হতো না কিছুই। ওজন কমলেও কয়েক দিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসত।.
২৫ বছর ধরে এভাবেই ওজন কমানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন মহেশ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভারী শরীর আর বয়ে বেড়াতে চাচ্ছিলেন না তিনি। ঠিক তখনই ২০২৪ সালে বিদেশের সংবাদমাধ্যমে ওজন কমানোর নতুন এক ধরনের ইনজেকশন নিয়ে খবর পড়তে শুরু করেন মহেশ। নিয়মিত পত্রিকা ঘেঁটে আপডেট নিতেন আর চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বারবার জানতে চাইতেন, 'ভারতে কবে আসবে এই ওষুধ?'.
অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে মার্কিন কোম্পানি এলি লিলির ওজন কমানোর ওষুধ 'তিরজেপ্যাটাইড' (মাউঞ্জারো) ভারতের বাজারে আসে। খবর পাওয়া মাত্রই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন মহেশ। চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করেন এই ওষুধের ব্যবহার।.
ফল মিলল হাতেনাতে। মাত্র নয় মাসে মহেশের ওজন কমেছে ১০ কেজি। গত কয়েক দশকে যা তিনি কখনোই করতে পারেননি, তা সম্ভব হয়েছে এই কয়েক মাসেই। শুধু ওজন কমানোই নয়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মহেশের রক্তে শর্করার মাত্রা ১০০-তে নেমে এসেছে। ২৫ বছরের অসুস্থতার জীবনে এমন 'জাদুকরী' পরিবর্তন আগে কখনো দেখেননি তিনি।.
ওজন কমানোর এই ইনজেকশন মহেশের জীবনে শুধু পরিবর্তনই আনেনি, বরং অনেক পুরনো অভ্যাসও বদলে দিয়েছে। তার শরীরের ক্ষতিকর চর্বি বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা এই প্রথম কমেছে। বেড়েছে কাজের উদ্যম। এমনকি মুখরোচক খাবারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের তীব্র আকাঙ্ক্ষাও এখন উধাও। .
মহেশ বলেন, 'গত ২৫ বছর ধরে প্রতি রোববার ব্যাডমিন্টন শেষে বাড়ি ফেরার সময় আমি নিয়ম করে সমুচা কিনতাম। এখন আর কিনি না। সেই লালসা এখন নেই বললেই চলে।'.
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ফার্মার্যাক'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাজারে আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই 'মাউঞ্জারো' ভারতের দ্বিতীয় শীর্ষ ওষুধের ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। ওজন কমানোর ওষুধের এমন আকাশচুম্বী চাহিদার কারণে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারেও দাপট দেখাচ্ছে এর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এলি লিলি। এ বছর তাদের শেয়ারের দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশেরও বেশি এবং বাজারমূল্য ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।.
তবে এই ম্যাজিক পিল বা ইনজেকশনের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মহেশ জানান, প্রতি মাসে এই ইনজেকশনের পেছনে তার খরচ হয় প্রায় ২৫ হাজার রুপি। অনেক কর্মজীবীর মাসিক বেতনের চেয়েও এই খরচ বেশি।.
দামের বিষয়ে মহেশ বলেন, 'হ্যাঁ, এটি অবশ্যই ব্যয়বহুল। তবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ এখন আমার ইনসুলিন নেওয়ার মাত্রা কমেছে, সেই সঙ্গে ডায়াবেটিসের অন্য ওষুধের খরচও অনেক কমে গেছে।'.
সুফলের চেয়ে ঝুঁকিই বেশি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা.
মেদ কমানোর এই 'জাদুকরী' ওষুধের যেমন সুফল আছে, তেমনি আছে কিছু ঝুঁকিও। জনপ্রিয় ব্র্যান্ড 'ওয়েগোভি'-র তথ্যমতে, এই ইনজেকশন ব্যবহারের ফলে বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে।.
ভারতে বলিউড তারকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের দেখে অনেকেই শরীর সচেতন হয়ে উঠছেন। কিন্তু চিকিৎসকদের ভয়, ওজন কমানোর এই ওষুধগুলোর অপব্যবহার হতে পারে। ইতিমধ্যে অনেক ক্লিনিক বিয়ের আগে দ্রুত ওজন কমানোর 'ক্রাশ প্রোগ্রাম' হিসেবে এই ইনজেকশনের বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে।.
স্থূলতা বিশেষজ্ঞ ডক্টর রাজীব কোভিল বলেন, 'চাহিদা বাড়লে ওষুধের অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থাকেই। বিয়ের আগে বা কোনো অনুষ্ঠানে সুন্দর দেখানোর জন্য এই ওষুধ ব্যবহার করা মোটেও উচিত নয়।'.
দিল্লি সংলগ্ন ফোর্টিস হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডক্টর অতুল লুথরা বলেন, 'সেমাগ্লুটাইড কেবল ওজন কমানোর একটি সরঞ্জাম মাত্র। এর সুফল পেতে হলে নিয়মিত শরীরচর্চা আর সুষম খাদ্যাভ্যাস জরুরি। খাদ্যাভ্যাস ঠিক না রাখলে পেটের নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।'.
এদিকে ৭০ বছর বয়সী মহেশ চামাদিয়া অবশ্য এসবে দমছেন না। তিনি এখন নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন এই ওষুধের আরও শক্তিশালী সংস্করণ কবে বাজারে আসবে। মহেশ তার ৩৮ বছর বয়সী ছেলেকেও এই ইনজেকশন নিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। তার মতে, এটি কেবল ওজন কমানোর জন্য নয়, বরং রক্তে শর্করা এবং লিভারের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখার এক মোক্ষম উপায়।.
Ajker Bogura / Md.Showrov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: