• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

কুড়া ইগল ও গিরিয়া হাঁসের গল্প


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: রবিবার, ০৯ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১২:৩৫ পিএম
বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ইগলগুলোর একটি প্রজাতি এই পাখি।

চলতি বছরের ভাদ্র মাসের শেষ ভাগে হঠাৎ করেই একটি দুঃসংবাদ পেলাম। দুই জোড়া কুড়া ইগলের বাসার জায়গা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। সবে দুই জোড়া কুড়া ইগল তাদের বাসা তৈরির জন্য জায়গা খুঁজে পেয়েছে। একটি বাসা ছিল ছাতিম গাছে ও অন্যটি জামগাছে। জায়গাটা হলো টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকা সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা ইউনিয়নের মহেশখোলা এলাকার দাতিয়াপাড়ার একটি কবরস্থানে। পুরো এ অঞ্চলের কুড়া পাখির বাসার খোঁজখবর রাখেন শামীম। তিনি আমাদের স্থানীয় সহকর্মী ও নৌকাচালক। তাঁর কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাঁকে অনুরোধ করলাম সেখানে গিয়ে গ্রামবাসীকে বোঝাতে। পাখিগুলো যে মূল্যবান, তার বার্তা দিতে।.

শামীম আমাদের আরেক সহকর্মী ইয়াহিয়াকে নিয়ে সেখানে গেলেন। একটি ছোট্ট সভাও করলেন। এতে সামান্য কিছু পয়সা খরচ হলো। কিন্তু দিন শেষে গ্রামবাসী গাছগুলো না কাটার সিদ্ধান্ত নিলেন। গ্রামবাসীর পক্ষে নূর মিয়া গাছ না কাটার একটি চুক্তিতে স্বাক্ষরও করলেন। বেঁচে গেল দুই জোড়া কুড়া ইগলের সংসার।.

এবার বলি এই কুড়া ইগলের কথা। বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ইগলগুলোর একটি প্রজাতি এই পাখি। শীতে এরা আমাদের হাওর এলাকায় আসে মূলত বাসা বানাতে। গরমে এরা চলে যায় তিব্বত আর মঙ্গোলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে। আমাদের হাওরে বড় গাছ আর বাসা বানানোর জায়গা না থাকলে সত্যিই এরা দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাবে।.

কুড়া ইগল মূলত মাছ আর জলজ পাখি ধরে খায়, যা হাওরে খুব সহজেই পাওয়া যায়। প্রতিবছরই এই কুড়া ইগলের সংখ্যা গণনা করতে আমি হাওর অঞ্চল ঘুরে বেড়াই। এই ইগল নিয়ে কত শত স্মৃতি তা বলে বোঝাতে পারব না। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক ঘটনা বলি। টাঙ্গুয়ার হাওরে তখন জলচর পাখি গণনা করছিলাম। হঠাৎ করেই দেখলাম মাথার ওপর একটি কুড়া ইগল। বুঝতে পারলাম হাওরের রাজা এসেছে তার খাবার সংগ্রহে। তখন সেখানে হাজার হাজার হাঁস পাখি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেল মুহূর্তেই। প্রথমেই ইগলটি টার্গেট করল পাতিকুট নামের একটি পাখিকে। তিনবারের চেষ্টায় ইগলটি পাখি ধরতে ব্যর্থ হলো। তবে বাইনোকুলারে দেখতে পেলাম চতুর্থবারে একটি হাঁস ধরল। অস্পষ্ট হলেও বুঝতে পারলাম ইগলটি একটি গিরিয়া হাঁস ধরেছে। এ রকম দৃশ্য আমি বহুবার দেখেছি বিধায় খুব বেশি আমলে নিলাম না।.

আমাদের দেশেই ছোট্ট এই হাঁস পাখি গিরিয়া  আসে শীতকালে .

আমাদের দেশেই ছোট্ট এই হাঁস পাখি গিরিয়া আসে শীতকালে.

ছবি: সাকিব আহমেদ.

পাখি গণনা শেষে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম ক্যাম্পে। আমরা তাঁবু করে থাকি হাওরপারের গোলবাড়ি এলাকায়। সন্ধ্যায় আমার সুইডিশ পাখি–গবেষক বন্ধু জোনাস বললেন, একটি গিরিয়া হাঁসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার কথায় অবাকই হয়ে গেলাম। সে বলল দুই দিন আগে যে গিরিয়া হাঁসের গায়ে স্যাটেলাইট যন্ত্রটি বসিয়েছিলাম, তাকে একটি মানুষের বাসায় আছে বলে মনে হচ্ছে। তার মানে পাখিটিকে কোনো শিকারি হয়তো শিকার করে খেয়ে ফেলেছে। একটু বলে রাখা ভালো, হাঁসের গায়ে বৈজ্ঞানিকভাবে স্যাটেলাইট যন্ত্রটি বসিয়েছিলাম মূলত তার গতিপথ পর্যবেক্ষণ করার জন্য।.

পরদিন খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে হাওরপারের রামসিংপুর রওনা দিলাম। আমরা জানি, জিপিএস ম্যাপ ধরে গেলে একেবারেই সঠিক নিশানায় পৌঁছাতে পারব। ঠিক তা–ই হলো, বাড়িটি আমরা খুঁজে পেলাম। কিন্তু বাড়িওয়ালা কোনোভাবেই স্বীকার করল না যে সে পাখিশিকারি। সে বলল তারা শিকার করে কখনো পাখি খায়নি। এ রকম একটি সংশয় নিয়ে তার বাড়ির চালে তাকালাম। দেখলাম তার চালের ওপর একটি লম্বা মোবাইল টাওয়ার। আর সেই টাওয়ারেই কুড়া ইগলের বাসা। মনে আর সংশয় রইল না যে এই কুড়া ইগলই আমাদের আরেক প্রিয় পাখি গিরিয়াকে খেয়ে ফেলেছে। টাওয়ারের ওপর আমাদের আরেক সহকর্মী সাকিব উঠে গেলেন। খুঁজে পেলেন সেই স্যাটেলাইট যন্ত্রটি আর গিরিয়ার পালক।.

এবার একটু গিরিয়ার কথা বলি। আমাদের দেশেই ছোট্ট এই হাঁস পাখিটিও আসে শীতকালে। ওই তিব্বত আর মঙ্গোলিয়া থেকে। গরমকালে তারা প্রজননকাল পার করে এসব এলাকায়। কুড়ারা সময়টা ওই অঞ্চলে যায় খাবারের উদ্দেশ্যে।.

গত কয়েক বছরে এই দুই প্রজাতির পাখির জীবনসংগ্রাম আরও ভালোভাবে খেয়াল করছি। হাওরের রামসিংপুর এলাকায় যে ইগলগুলো বাসা বেঁধেছিল, তাদের বাচ্চাই আবার মহেশখোলা গিয়ে তাদের সংসার সাজিয়েছে। হাওরে এই ইগল রাজা হলেও যখন মানুষ গাছ কেটে তাদের ঘর ভাঙে, তখন আসলেই তারা অসহায়। সত্যিই যদি ওই গাছগুলো কাটা হতো, তারা হয়তো এ বছরটা একবুক হাহাকার নিয়ে ঘুরত। ফিরে যেত শূন্য হাতে!. .

Ajker Bogura / Md Ajmain Ekteder Adib

আবহাওয়া / পরিবেশ বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ