অনলাইনে বাড়তি আয়ের আশায় প্রতিদিনই অসংখ্য বাংলাদেশি পা দিচ্ছেন ডিজিটাল প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় অফার, পার্টটাইম কাজের লোভ কিংবা বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রস্তাব—সবকিছুর আড়ালে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক স্ক্যাম চক্র।
সম্প্রতি রাজধানীর একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা নতুন করে সামনে এনেছে এই ভয়াবহ বাস্তবতা। ফেসবুকে একটি রিক্রুটিং পেজ থেকে অনলাইনে কাজের প্রস্তাব পান তিনি। কাজের ধরন ছিল সহজ—বিদেশি সিনেমা বা প্রতিষ্ঠানে রেটিং দেওয়া। প্রথমদিকে অল্প কিছু কাজের বিনিময়ে বিকাশে টাকা পাওয়ায় তার আস্থা তৈরি হয়। এরপর ধাপে ধাপে তাকে বড় অঙ্কের টাকা ‘ডিপোজিট’ দিতে উৎসাহিত করা হয়। প্রতিবারই দেখানো হয় বিশাল লাভের হিসাব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কয়েক কোটি টাকার লভ্যাংশ দেখিয়েও টাকা তুলতে না দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় প্রতারকরা। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, সবই ছিল সাজানো নাটক।
এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। সিআইডি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা স্ক্যাম সেন্টারগুলো বাংলাদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা চালাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হয়, সেগুলো ভুয়া পরিচয়ে খোলা কিংবা প্রকৃত হিসাবধারীর অজান্তেই ব্যবহৃত হচ্ছে। টাকা জমার সঙ্গে সঙ্গেই তা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই স্ক্যাম চক্রগুলো বাংলাদেশি তরুণদেরও নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে। ভালো চাকরির আশ্বাস দিয়ে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাদের জোরপূর্বক স্ক্যামিং কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় গেলেও অনেককে প্রতারণা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখানে আটকে রাখা হয়।
স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হয়ে ফেরা ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে নির্মম চিত্র। নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী মানুষের ফোন নম্বর, ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহ করতে না পারলে তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। রোদে দৌড়ানো, ভারী জিনিস বহন, দিনের পর দিন অন্ধকার ঘরে আটকে রাখার মতো অমানবিক আচরণ সেখানে নিত্যদিনের ঘটনা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধারে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হলেও প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে হঠাৎ আসা আয়ের প্রস্তাব, অস্বাভাবিক লাভের প্রতিশ্রুতি কিংবা অচেনা দেশে চাকরির অফার—এসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। যাচাই ছাড়া কোনো লিংকে ক্লিক করা, টাকা জমা দেওয়া বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করাই অনেক সময় সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ডিজিটাল যুগে সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রতারণার কৌশলও। সচেতনতা আর সতর্কতাই পারে এই ভয়ংকর স্ক্যাম চক্র থেকে নিজেকে ও অন্যদের রক্ষা করতে।.
Ajker Bogura / Samsil Arifin
আপনার মতামত লিখুন: