• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ; ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

Advertise your products here

সিম যাচাই অভিযান: টানা তৃতীয় মাসের মতো কমল মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা


Ajker Bogura ; প্রকাশিত: শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১০:০৫ এএম
সিম যাচাই অভিযান: টানা তৃতীয় মাসের মতো কমল মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা
সিম যাচাই অভিযান: টানা তৃতীয় মাসের মতো কমল মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালু করাকে সামনে রেখে চলমান সিম যাচাই ও নিষ্ক্রিয়করণ অভিযানের ফলে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তৃতীয় মাস বাংলাদেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে।.

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮.৭৯৭ কোটি, যা আগস্টে ছিল ১৮.৮৫৭ কোটি ও জুলাইয়ে ছিল ১৮.৮৮৭ কোটি। .

এই হিসাবে, প্রতি মাসে গড়ে ০.২৪ শতাংশ বা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহক কমেছে। .

অপারেটরভিত্তিক পারফরম্যান্স.

চার মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক কমেছে সবচেয়ে বেশি। সেপ্টেম্বরে তারা ৬ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক হারিয়েছে। আগস্টে অপারেটরটির গ্রাহক সংখ্যা ৮.৬৪৭ কোটি থাকলেও সেপ্টেম্বরে তা ৮.৫৮৫ কোটিতে নেমে আসে।.

এটি গ্রামীণফোনের টানা তৃতীয় মাসিক পতন। জুলাই থেকে এ পর্যন্ত তাদের মোট গ্রাহক কমেছে প্রায় ৮ লাখ।.

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকসংখ্যা এভাবে কমার কারণ সিম পুনঃযাচাই অভিযান, বাজারেমূল্যের প্রতিযোগিতা ও নিষ্ক্রিয় বা একাধিক সিম বন্ধ হয়ে যাওয়া।.

অন্যদিকে এই পতনের ধারার বিপরীতে রবি আজিয়াটা সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ১০ হাজার নতুন গ্রাহক পেয়েছে। এতে তাদের মোট গ্রাহক সংখ্যা ৫.৭৫২ কোটিতে পৌঁছেছে।.

বৈচিত্র্যময় ডেটা বান্ডেল ও আকর্ষণীয় প্রচারণার ফলে ২০২৫ সালজুড়ে রবির গ্রাহক ভিত্তি তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।.

অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারি থেকে ক্রমাগত গ্রাহক কমছে বাংলালিংকের। সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ২০ হাজার গ্রাহক কমে যাওয়ার পর অপারেটরটির মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩.৭৯৩ কোটি। .

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিটক নতুন ৩০ হাজার গ্রাহক পাওয়ায় তাদের মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬.৭ লাখ। এই প্রবৃদ্ধি সীমিত হলেও প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলে ডিজিটাল সুবিধা পৌঁছানোর সরকারি প্রচেষ্টার ধীরগতির প্রভাবের প্রতিফলন ঘটেছে এতে।.

রবি আজিয়াটা পিএলসি বলেছে, স্বল্প মূল্যের সংযোগের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য অপারেটরদের মতো নয়, বরং তাদের এই প্রবৃদ্ধি এসেছে টেকসই ও মূল্যভিত্তিক গ্রাহক অর্জনের মাধ্যমে।.

'আমরা স্বল্পমেয়াদি গ্রাহক সংখ্যার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহক সম্পৃক্ততা ও সেবার অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এছাড়াও নতুন নতুন সাইট মোতায়েনের মাধ্যমে আমাদের নেটওয়ার্কের ক্রমাগত সম্প্রসারণ প্রধান প্রধান অঞ্চলগুলোতে কভারেজ ও সেবার মান বাড়িয়েছে। এই সমন্বিত কারণগুলোই আমাদের গ্রাহক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে এবং আমাদের নেটওয়ার্কের প্রতি গ্রাহকের আস্থা জোরদার করতে অবদান রাখছে,' বলেন রবি আজিয়াটা পিএলসির চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম।.

বাজারের সার্বিক গতিবিধি.

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট মোবাইল গ্রাহক ভিত্তি ১৮.৬৫৯ কোটি থেকে বেড়ে ১৮.৭৯৭ কোটিতে পৌঁছেছে, অর্থাৎ মোট ১৩.৮ লাখ গ্রাহক বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সময়ে প্রবৃদ্ধির হয়েছে ০.৭৪ শতাংশ।.

তবে এই প্রবৃদ্ধি জুলাইয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিপরীতমুখী হয়ে যায়। শুধু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরেই বাজার থেকে ৯ লাখ ব্যবহারকারী কমেছে।.

ত্রৈমাসিক বিশ্লেষণ.

প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এই খাতে গ্রাহক কমেছে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার। জানুয়ারিতে মোট গ্রাহক সংখ্যা ১৮.৬৫৯ কোটি থাকলেও মার্চে তা কমে দাঁড়ায় ১৮.৬২২ কোটি। এই সময়ে শুধু গ্রামীণফোনের প্রবৃদ্ধি হলেও বাংলালিংক ও রবি গ্রাহক হারায়।.

দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) এই চিত্র পাল্টে যায় এবং আগের পতন থেকে ঘুরে দাঁড়ায়। এপ্রিলে মোট গ্রাহক ১৮.৬৬৪ কোটি থাকলেও জুনে তা বেড়ে ১৮.৮৪৫ কোটিতে পৌঁছায়। এই প্রান্তিকে ১৮.১ লাখ নতুন গ্রাহক যোগ হয়, যা ছিল বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধি।.

তবে তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাজার আবার পতনের ধারায় ফেরে। এই সময়ে ৯ লাখ গ্রাহক কমে যায়। বেশিরভাগ অপারেটরের গ্রাহক সংখ্যাই ক্রমাগত কমতে থাকে। তবে আগস্টে পতনের পর সেপ্টেম্বরে রবি সামান্য ঘুরে দাঁড়ায়।.

এই ধারা বলছে, মূলত সিম যাচাই-বাছাই ও নিষ্ক্রিয় অভিযানের কারণে টেলিকম খাত ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে সম্প্রসারণের পর দ্বিতীয়ার্ধে এসে সংকোচনের মুখে পড়েছে।.

গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইয়াসির আজমান বলেন, 'আমরা স্বল্পমেয়াদি আশার পাশাপাশি কিছু অন্তর্নিহিত চ্যালেঞ্জও দেখতে পাচ্ছি। জাতীয় নির্বাচন আসন্ন, এর ফলে বাজারজুড়ে কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বল্পমেয়াদে একটি গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের এই নতুন চাহিদা কাজে লাগাতে এবং জাতীয় সংযুক্তি স্থাপনে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে আরও সুদৃঢ় করতে পারব বলে আশা করছি।'.

বাজার হিস্যা.

সাম্প্রতিক গ্রাহক হ্রাস সত্ত্বেও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রামীণফোন মোট গ্রাহকের ৪৫.৭ শতাংশ বাজার হিস্যা নিয়ে দেশের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।.

রবি আজিয়াটা ৩০.৬ শতাংশ বাজার হিস্যা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যা বাজারের চ্যালেঞ্জের মুখেও তাদের স্থিতিশীল পারফরম্যান্স এবং ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতাকে প্রতিফলিত করে।.

মোট সংযোগের ২০.২ শতাংশ বাংলালিংকের দখলে। অপারেটরটি গ্রাহক কমা ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে।.

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক ৩.৫ শতাংশ বাজার হিস্যা। সামান্য হলেও ক্রমান্বয়ে উন্নতি করছে অপারেটরটি। জাতীয় ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচির আওতায় সরকারের সংযোগ সম্প্রসারণ উদ্যোগগুলো এই প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।.

বাজারে এখনও গ্রামীণফোনের আধিপত্য থাকলেও তারা রবি ও টেলিটকের কাছে ক্রমাগত বাজার হিস্যা হারাচ্ছে।.

কমেছে ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যাও .

বিটিআরসির প্রতিবেদন বলছে, মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা আগস্টের ১৩.৫৩৩ কোটি থেকে সেপ্টেম্বরে ১৩.৪১৬ কোটিতে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক মাসেই ইন্টারনেট গ্রাহক কমেছে ১১.৭ লাখ বা ০.৮৬ শতাংশ।.

এই পতনের একমাত্র কারণ মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ কমা। এ সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২.০৮৭ কোটি থেকে কমে ১১.৯৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড (আইএসপি ও পিএসটিএন) গ্রাহক সংখ্যা ১.৪৪৬ কোটিতে স্থিতিশীল রয়েছে।.

সাম্প্রতিক এই মন্দা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৪১ লাখ বেড়েছে। .

মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগের অনুপাত.

বর্তমানে ১৮.৭৯৭ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী ও ১৩.৪১৬ কোটি ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭১ শতাংশ মোবাইল সিম এখন ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই বেশি।.

দেশের মোট অনলাইন সংযোগের প্রায় ৮৯ শতাংশ আসে মোবাইল ইন্টারনেট থেকে। অন্যদিকে ব্রডব্যান্ড স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে, যা মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ১০.৮ শতাংশ।.

ব্রডব্যান্ডের এই স্থিতিশীল গ্রাহক ভিত্তি শহুরে পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর ধারাবাহিক ব্যবহারকেই তুলে ধরে।.

বাজারের চিত্র বদলে দিতে পারে এনইআইআর.

আগামী ১৬ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থা চালুর কথা রয়েছে। টেলিকম শিল্প ধারণা করছে, এর ফলে স্বল্পমেয়াদে গ্রাহক সংখ্যা কমতে পারে, কারণ অনিবন্ধিত ও অবৈধ হ্যান্ডসেটগুলো নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার হারাবে।.

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনইআইআর ব্যবস্থা নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা বৃদ্ধি, সিমের অপব্যবহার রোধ ও গ্রাহক তথ্যের নির্ভুলতা বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।.

চলমান এই সংকোচন সত্ত্বেও ১৮.৭ কোটির বেশি মোবাইল গ্রাহক ও ১৩.৪ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংযুক্ত দেশ রয়েছে গেছে।.

এই খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, এনইআইআর চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহক সংখ্যার বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধির দিন শেষ হতে পারে। এখন এই খাতটি টেকসই ডিজিটাল রূপান্তর, সেবার মান বৃদ্ধি ও উদ্ভাবন-নির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে এগোতে যাচ্ছে।.

.

Ajker Bogura / Md.Showrov Hossain

তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ