তাইওয়ান নিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মন্তব্যের জেরে চীন তার নাগরিকদের দেশটিতে ভ্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছে এবং বেইজিংয়ে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। খবর বিবিসি'র।.
তাকাইচি বলেছিলেন, চীন তাইওয়ানকে আক্রমণ করলে জাপান তার নিজস্ব আত্মরক্ষা বাহিনী দিয়ে জবাব দিতে পারে। তার এই মন্তব্যে এই সপ্তাহে চীন ও জাপান এক ক্রমবর্ধমান বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। .
উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে অপরের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। একজন চীনা কূটনীতিকও এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যাকে কেউ কেউ তাকাইচিকে শিরশ্ছেদ করার হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।.
এই বিবাদের মূলে রয়েছে চীন ও জাপানের মধ্যকার ঐতিহাসিক শত্রুতা এবং স্বায়ত্তশাসিত তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের 'কৌশলগত অস্পষ্টতা'।.
কী ঘটেছে?.
গত শুক্রবার জাপানের পার্লামেন্টে একটি বৈঠক থেকে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। দেশটির একজন বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা তাকাইচিকে জিজ্ঞাসা করেন, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোন পরিস্থিতি জাপানের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে গণ্য হবে।.
তাকাইচি উত্তর দেন, 'যদি যুদ্ধজাহাজ এবং শক্তির ব্যবহার হয়, আপনি যেভাবে ভাবুন না কেন, এটি একটি অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে গণ্য হতে পারে।'.
'অস্তিত্বের হুমকি' জাপানের ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইনের অধীনে একটি আইনি পরিভাষা। এটি বোঝায়, যে কোনো মিত্র দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে জাপানের জন্য অস্তিত্বের সংকট তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী হুমকি মোকাবেলায় সক্রিয় হতে পারে।.
তাকাইচির এই মন্তব্য বেইজিংয়ের তাৎক্ষণিক ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে 'জঘন্য' বলে অভিহিত করে।.
গত শনিবার, জাপানের ওসাকা শহরে চীনের কনসাল জেনারেল জুয়ে জিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তাকাইচির পার্লামেন্টারি মন্তব্য নিয়ে একটি সংবাদ নিবন্ধ পুনরায় শেয়ার করেন। তবে তিনি তার নিজের মন্তব্যও যোগ করে বলেন, 'যে নোংরা মাথা নাক গলায়, তা কেটে ফেলতে হবে।'.
জাপানের চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি মিনোরু কিহারা সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, জুয়ের মন্তব্যের উদ্দেশ্য 'হয়তো স্পষ্ট নয়', তবে তা 'অত্যন্ত অনুচিত' ছিল।.
টোকিও জুয়ের মন্তব্যের জন্য চীনের কাছে প্রতিবাদ জানায়, আর বেইজিং তাকাইচির মন্তব্যের জন্য জাপানের কাছে তাদের নিজস্ব প্রতিবাদ জানায়।.
জুয়ের পোস্টটি তখন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এই তিক্ত বাক্য বিনিময়ের রেশ এখনো কাটেনি।.
মঙ্গলবার তাকাইচি তার মন্তব্য প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানান এবং এটিকে 'সরকারের ঐতিহ্যবাহী অবস্থানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ' বলে যুক্তি দেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এখন থেকে তিনি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন।.
এরপর বৃহস্পতিবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে জাপানি ও ইংরেজিতে পোস্ট করে জাপানকে সতর্ক করে 'আগুন নিয়ে খেলা বন্ধ করতে'; এবং যোগ করে, জাপান যদি 'আন্তঃপ্রণালী পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার সাহস দেখায়' তবে এটি 'আগ্রাসনের কাজ' হবে।.
চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইদং একই দিনে জাপানে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন।.
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুসারে, সান তাকাইচির মন্তব্যকে 'অত্যন্ত ভুল এবং বিপজ্জনক' হিসেবে অভিহিত করেন এবং জাপানকে মন্তব্যগুলো প্রত্যাহার করার দাবি জানান। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, 'অন্যথায় সমস্ত পরিণতি জাপানকেই বহন করতে হবে।''.
মিনোরু কিহারা জানিয়েছেন, জাপানের রাষ্ট্রদূত ব্যাখ্যা দেন—তাইওয়ান নিয়ে জাপানের অবস্থান 'পরিবর্তিত হয়নি' এবং বেইজিংয়ের মন্তব্যকে খণ্ডন করেন।.
দৈনিক সংবাদ সম্মেলনের সময় তিনি বলেন, 'এটি জাপানি সরকারের ধারাবাহিক অবস্থান যে আমরা সংলাপের মাধ্যমে তাইওয়ানকে ঘিরে বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান আশা করি।'.
কিহারা আরও যোগ করেন, জাপান জুয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যের জন্য 'চীনকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে জোরালোভাবে অনুরোধ করেছে'।.
এরপর শুক্রবার রাতে জাপানে অবস্থিত চীনা দূতাবাস একটি বিবৃতি প্রকাশ করে নাগরিকদের 'তাইওয়ান নিয়ে স্পষ্টভাবে উসকানিমূলক মন্তব্যের' জন্য 'নিকট ভবিষ্যতে জাপানে ভ্রমণ এড়াতে' অনুরোধ করে।.
শত্রুতার দীর্ঘ ইতিহাস.
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা রয়েছে, যা ১৮০০-এর দশকের একাধিক সশস্ত্র সংঘাত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চীনে জাপানের নৃশংস সামরিক অভিযানের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায়।.
বৃহস্পতিবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, 'যদি জাপান ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয় এবং তাইওয়ান প্রণালীর পরিস্থিতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের মতো বেপরোয়া ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখায়, তবে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির লৌহ প্রাচীরের সামনে তাকে অনিবার্যভাবে বড় ক্ষতি এবং তিক্ত মূল্য দিতে হবে।'.
ঐতিহাসিক ক্ষোভগুলো তখন থেকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যন্ত্রণাদায়ক বিষয় হয়ে রয়েছে। তবে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের একজন অনুসারী হিসেবে তাকাইচির সাম্প্রতিক উত্থান ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতে আরও উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।.
এই রক্ষণশীল নেত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছেন এবং জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—যা বেইজিংয়ে কিছুটা শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।.
তাকাইচি চীনের প্রতি কট্টরপন্থী এবং তাইওয়ানের দীর্ঘদিনের সমর্থক হিসেবেও পরিচিত। তিনি এর আগে বলেছেন্ দ্বীপটির অবরোধ জাপানকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এবং জাপান চীনা আক্রমণ ঠেকাতে তার সৈন্য মোতায়েন করতে পারে।.
চীন তাইওয়ান নিয়ে খুব সংবেদনশীল, কারণ তারা এই স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে। চীন তাইওয়ান দখলের জন্য শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা পুরোপুরি অস্বীকার করছে না—এমন ভঙ্গি তাইপেই ও এই অঞ্চলের বেইজিং-সংশ্লিষ্ট মিত্রদের অস্বস্তিতে ফেলেছে।.
এই মাসের শুরুতে বেইজিং তাকাইচিকে 'এক-চীন নীতি' ভাঙার অভিযোগে অভিযুক্ত করে, যখন তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যাপেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে একজন জ্যেষ্ঠ তাইওয়ানি কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের ছবি পোস্ট করেন।.
তাকাইচির মন্তব্য কেন এত আলোড়ন সৃষ্টি করল?.
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো দেখায়, তারা তাইওয়ানের মর্যাদা নিয়ে ঐতিহ্যগত অস্পষ্ট অবস্থান থেকে একটু ভিন্ন ভাবছে।.
এটি 'কৌশলগত অস্পষ্টতা' নীতির সঙ্গে মিলে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরে অনুসরণ করছে। এই নীতিতে, যদি চীন আক্রমণ করে, তারা তাইওয়ানকে রক্ষা করতে কী করবে, তা স্পষ্ট বলা হয় না।.
জাপানি সরকারের অবস্থান হলো, তারা আশা করে তাইওয়ান সম্পর্কিত সমস্যা সংলাপের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে। সাধারণত জাপানি কর্মকর্তারা নিরাপত্তা বিষয়ক প্রকাশ্য আলোচনায় তাইওয়ানের নাম এড়িয়ে চলেন।.
যেখানে তারা তা করেছেন, সেখানে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দার মুখোমুখি হয়েছেন।.
২০২১ সালে যখন তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী তারো আসো বলেন যে একটি আক্রমণের ক্ষেত্রে জাপানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তাইওয়ানকে রক্ষা করতে হবে, তখন বেইজিং তার মন্তব্যের নিন্দা করে এবং জাপানকে 'তার ভুল সংশোধন করতে' বলে।.
এই সাম্প্রতিক উত্তেজনায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাকাইচির মন্তব্যগুলো 'চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সামষ্টিক হস্তক্ষেপ'।.
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'তাইওয়ান চীনের তাইওয়ান।' তিনি আরও বলেন, চীন এই বিষয়ে 'কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না'.
Ajker Bogura / Md.Showrov Hossain
আপনার মতামত লিখুন: