মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে সোনালি মুরগির দাম। ব্যবসায়ীদের মতে, এই দাম নজিরবিহীন।.
ছবি: সংগৃহীত.
মৌসুমি রোগে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ও ফিডের (খাদ্য) উচ্চমূল্যের কারণে ঢাকায় সোনালি মুরগির দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। .
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে সোনালি মুরগির দাম। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪৪০ থেকে ৪৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের মতে, এই দাম নজিরবিহীন।.
কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল, রামপুরা, মগবাজার ও মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, আকারভেদে এক সপ্তাহের মধ্যেই দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত। দেশি মুরগির দামও প্রায় ১০০ টাকা বেড়ে কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা ছাড়িয়েছে।.
ব্যবসায়ীরা জানান, এর আগে কখনো সোনালি মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা ছাড়ায়নি। ফলে বর্তমান ৪৫০ টাকায় পৌঁছানোকে রেকর্ড বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, খামার থেকে হঠাৎ সরবরাহ কমে যাওয়াই এ দাম বৃদ্ধির মূল কারণ।.
কারওয়ান বাজারের রোকেয়া ব্রয়লার হাউসের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, "বাজারে পর্যাপ্ত মুরগি আসছে না, বিশেষ করে সোনালি ও দেশি মুরগি। তাই আমরা বাধ্য হয়ে সোনালি ৪৪০-৪৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭৫০-৮০০ টাকায় বিক্রি করছি। দাম বাড়ায় অনেক ক্রেতা ব্রয়লার মুরগির দিকে ঝুঁকছেন।".
আমিনুলের সঙ্গে একমত পোষণ করে অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও জানান, তারা সাধারণত সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে মুরগি সংগ্রহ করেন। তবে বর্তমানে আগের তুলনায় কম সরবরাহ পাচ্ছেন। আগে নিয়মিত ট্রাকভর্তি মুরগি আসলেও এখন উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহও কমে গেছে।.
বাংলাদেশ ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি সপ্তাহে সোনালি ও রঙিন মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। এর মধ্যে বিভিন্ন কারণে সাধারণত ৫ থেকে ৮ লাখ বাচ্চা মারা যায়। তবে গত দুই সপ্তাহে বাজারে সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটিতে।.
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শাহ ফাহাদ হাবিব বলেন, গত বছর বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় দাম কমে যায়, এতে খামারিরা লোকসানের মুখে পড়েন। ফলে অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন।.
তিনি বলেন, "একই সময়ে বার্ড ফ্লু'র মতো রোগ বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যুহারও বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে সরবরাহ আরও কমে গেছে। এর ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে দাম বেড়ে গেছে।".
মৌসুমি ফ্লু মূল কারণ.
নওগাঁর আমাল অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক মোহাম্মদ আসাদ আলী জানান, তার খামারে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার সোনালি বাচ্চা উৎপাদন হয়। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে মোবাইল ফোনে বলেন, "আগে পরিপক্ব হওয়ার আগেই ১৫০-২০০টি বাচ্চা মারা যেত। কিন্তু গত এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১,০০০ থেকে ১,২০০-তে পৌঁছেছে।".
তিনি বলেন, "১৮-২০ দিন বয়সে মুরগিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসা দেওয়ার পরও অনেকগুলো সুস্থ হয় না।".
তিনি আরও বলেন, আগে যেখানে মৃত্যুহার ছিল ২-৩ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ১০-১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে খামারিরা অন্তত খরচের কিছু অংশ তুলতে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। "ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতি কেজিতে ৩০-৪০ টাকা দাম বাড়াতে হয়েছে, তবুও আমরা এখনো লোকসান গুনছি।".
রাজশাহীর আরেক খামারি মোহাম্মদ এনামুল হক জানান, আরও ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন। তিনি বলেন, "প্রতি বছর শীতের শেষে কিছু রোগ দেখা দেয়, তবে এবার পরিস্থিতি আরও গুরুতর। কিছু খামারে প্রায় অর্ধেক মুরগি মারা যাচ্ছে।" .
তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।.
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা এমন যে, বিষয়টি পশুচিকিৎসকদেরও বিস্মিত করেছে।.
সংগঠনটির সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, "খামার পর্যায়ে আমরা ভেটেরিনারি সহায়তা দিচ্ছি, কিন্তু চিকিৎসকেরা সুনির্দিষ্টভাবে রোগটি শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতি বছরই এমন মৌসুমি প্রাদুর্ভাব ঘটে, তবে এবার তা অনেক বেশি তীব্র।".
তিনি জানান, সোনালি মুরগির সরবরাহের ৯০ শতাংশের বেশি আসে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে, ফলে এ খাতটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। "সোনালির সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাপ এখন ব্রয়লার মুরগির ওপর পড়ছে, এতে সব ধরনের মুরগির দামই বেড়ে যাচ্ছে।".
যোগাযোগ করা হলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. আবু সুফিয়ান পত্রিকাটিকে জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিছু পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।.
তিনি বলেন, "তবে এটি বার্ড ফ্লু কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। জেলা ও উপজেলায় খামারগুলোতে নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো খামারে মুরগি মারা গেলে নমুনা সংগ্রহ করে দ্রুত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।".
একই সঙ্গে খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।.
খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন খরচে বাড়তি চাপ.
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি পশুখাদ্যের দামও বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।.
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত দুই সপ্তাহে পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা কমেছে। অন্যদিকে খামারে উৎপাদন কম থাকায় সংগ্রহকারীদের কম মুরগি সংগ্রহ করতে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হচ্ছে, ফলে প্রতি ইউনিটে খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।.
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, আগে যেখানে ব্যবসায়ীরা খামার থেকে ৫ হাজার মুরগি সংগ্রহ করতেন, এখন সেখানে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০টির বেশি পাচ্ছেন না। ফলে মুরগি সংগ্রহের খরচ বেড়ে গেছে।.
তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে গত এক মাসে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের দাম অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে।.
তিনি বলেন, "খাদ্য দেশেই উৎপাদন করা হলেও এর কাঁচামালের জন্য আমরা অনেকাংশে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে প্রতি কেজিতে প্রায় আড়াই টাকা দাম বেড়েছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।".
খামারিদের লোকসানে সরবরাহ সংকট আরও গভীর হচ্ছে .
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ন্যায্য দাম না পেয়ে অনেক প্রান্তিক খামারি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।.
তিনি বলেন, "গত সাত মাস ধরে খামারিরা ডিম ও মুরগি উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করছেন। এতে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে বাজার থেকে বের হয়ে গেছেন। এখন আবার খাদ্যের দাম বাড়ায় তারা উৎপাদন শুরু করতে অনাগ্রহী।".
তিনি সতর্ক করে বলেন, উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে সামনে দাম আরও বাড়তে পারে।.
এদিকে, দামের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি এস এম নজরুল হোসেন বলেন, "দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতাই কমে যায়।".
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ব্যবসায়ীরা বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন, যদিও অনেক পণ্য আগেই আমদানি করা থাকে। বাজারে যথাযথ নজরদারি নিশ্চিত করা, মজুতদারি রোধ করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।. .